গাজীপুরের কালীগঞ্জে দুই হাজার টাকায় হত্যা : ১৪ মাসেও মেলেনি নিহতের মাথা

গাজীপুরের কালীগঞ্জে  দুই হাজার টাকায় হত্যা : ১৪ মাসেও মেলেনি নিহতের মাথা

সংগ্রহীত ছবি

গাজীপুরের কালীগঞ্জে মাত্র দুই হাজার টাকার বিনিময়ে তৈরি হয়েছিল এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা। তবে পরকীয়ার জেরে হত্যার শিকার জাকির হোসেনের (৩৮) শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা মাথাটি ১৪ মাসেও উদ্ধার করা যায়নি। শীতলক্ষ্যার তীরে নিহতের লুঙ্গি দিয়ে পেঁচিয়ে মাথাটি ফেলে দেয় হত্যাকারীরা—এমন স্বীকারোক্তি মিললেও কোথায় গেছে মাথাটি, তার কোনো হদিস মেলেনি। সম্প্রতি নৌ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী অটোরিকশাচালক হুমায়ুন ব্যাপারী।

তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসছে চমকপ্রদ সব তথ্য।

মাথাহীন লাশ উদ্ধার : গত বছরের ৮ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে কালীগঞ্জ থানা এলাকার মূলগাঁও কয়লাঘাটসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীর তীর থেকে উদ্ধার করা হয় এক মাথাহীন পুরুষের লাশ। লাশটি কিছুদিন পানিতে থাকায় পচে-গলে প্রায় বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। পরে তদন্তে মৃতদেহ কালীগঞ্জের জাকির হোসেনের বলে শনাক্ত হয়।

পরকীয়া থেকে জন্ম নেয় ঘৃণ্য নকশা : নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত জাকিরের স্ত্রী রেহেনা খাতুনের সঙ্গে হুমায়ুন ব্যাপারীর অবৈধ সম্পর্ক ছিল। এ নিয়ে জাকির ও আশপাশের কয়েকজন প্রতিবেশী হুমায়ুনকে একাধিকবার শাসায়। কিন্তু তাতে দমেননি হুমায়ুন। সূত্র জানায়, একসময় জাকির ক্ষোভের মাথায় হুমায়ুনকে বলেন, তিনি যদি রেহেনার পিছু না ছাড়েন, তাহলে তিনি হুমায়ুনের মেয়েকে বিয়ে করে ফেলবেন।

এতে হুমায়ুন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে হুমায়ুনের সঙ্গে জাকিরের সম্পর্ক আরো খারাপ হয়। দুদিক থেকে অপমানবোধ ও প্রতিশোধের আগুনই তাঁকে ঠেলে দেয় হত্যা পরিকল্পনার দিকে।

দুই হাজার টাকায় খুন : জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার আসামিরা জানান, হুমায়ুন মাত্র দুই হাজার টাকা দেন সহযোগী রতন ও কবিরকে। পরে হুমায়ুন, রতন ও কবির মিলে জাকিরকে ফাঁদে ফেলেন।

ঘটনার রাতে হুমায়ুন গাঁজা সেবনের কথা বলে জাকিরকে ডেকে নেন। নির্জন শীতলক্ষ্যার তীরে একটি পরিত্যক্ত ইটভাটার অফিসকক্ষে বসে গাঁজা সেবনের পরপরই শুরু হয় নৃশংসতা। জবানবন্দি অনুযায়ী, প্রথমে হুমাযুন লাঠি দিয়ে জাকিরের মাথায় আঘাত করেন। জাকির পড়ে গেলে তিনজন মিলে মুখ চেপে ধরেন। একের পর এক লাথি, কিল, ঘুষি মারতে থাকেন তাঁর গোপনাঙ্গে। অচেতন হওয়ার পরও নির্যাতন চলে। অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন জাকির।

কসাই রতন মাথা কাটেন : হুমায়ুনের নির্দেশে খুব অল্প সময়েই কসাই রতন চাকু ও ছুরি দিয়ে গলা কেটে মাথা আলাদা করেন। মাথা কাটার পর নিহতের লুঙ্গি দিয়ে পেঁচিয়ে রাতের আঁধারে শীতলক্ষ্যার তীরে ফেলে দেওয়া হয়। আর দেহটি ফেলে দেওয়া হয় নদীতীরের কচুরিপানার ভেতর। কিন্তু ১৪ মাসের অনুসন্ধানেও মাথাটি পাওয়া যায়নি। নদীতে ডজনেরও বেশিবার তল্লাশি, স্রোতের পথ ধরে বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান চালিয়েও কাজ হয়নি।

১৪ মাস পর মাস্টারমাইন্ড ধরা : হত্যার পর হুমায়ুন ব্যাপারী পরিবার নিয়ে চলে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন। একের পর এক মোবাইল নম্বরও বদলে ফেলেন। কিন্তু নৌ পুলিশের দীর্ঘ নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও সোর্সের তথ্যের সমন্বয়ে অবশেষে গ্রেপ্তার হন হত্যাকাণ্ডের প্রথম সহযোগী কবির হোসেন। তাঁর দেওয়া তথ্য থেকে রতনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রতন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এর পরই গ্রেপ্তার হন মূল পরিকল্পনাকারী হুমায়ুন। রিমান্ডে হুমায়ুনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে সূত্র।

তদন্তে নতুন অগ্রগতি : নৌ পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হুমায়ুনকে গ্রেপ্তারের পর হত্যার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা, সহযোগিতা এবং মাথা গুমের পদ্ধতি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। তবে মাথার অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। পুলিশ মনে করছে, স্রোতের কারণে মাথাটি দূরে ভেসে যেতে পারে, কেউ হয়তো খুঁজে পেয়েও গুরুত্ব দেয়নি কিংবা নদীর নিচে পলির স্তরে চাপা পড়ে গেছে। মাথাটি পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরো পরিষ্কার হবে।

পরিবারের আর্তনাদ : জাকির হোসেনের স্ত্রী ঘটনার পর থেকে বাবার বাড়ি। সন্তানের সঙ্গে তাঁর তেমন যোগাযোগ নেই। তবে দুই সন্তান আজও আকাশ ভেঙে পড়া অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। জাকিরের মেয়ে জাকিয়া আক্তার ও কিশোর ছেলে সাকিব মিয়া বাবার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে। সাকিব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘আমরা এখনো বাবার মাথা পাইনি। এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? যারা আমাদের এতিম বানিয়েছে সেসব খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।’

যা বলছে নৌ পুলিশ : ঢাকা অঞ্চলের নৌ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মাস্টারমাইন্ড হুমায়ুন গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। ধাপে ধাপে মাথা গুমের রহস্যও বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছি।’ মামলার তদন্তকাজ নিয়ে ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, নতুন করে তদন্ত তদারকি করছি। প্রথম আসামি কবিরকে ধরার পর একে একে সবাইকে ধরা হয়। আর নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘এ ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলায় আমরা নিয়মিতভাবে গ্রেপ্তার ও তদন্ত করে যাচ্ছি। কিছু অতিরিক্ত লজিস্টিক সহায়তা পেলে তদন্ত আরো দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে।’