শারীরিক মানসিক রোগ থেকে শেফার দোয়া

শারীরিক মানসিক রোগ থেকে শেফার দোয়া

প্রতিকী ছবি

বুক। পৃথিবীর সবচয়ে নিরাপদ জায়গা। শান্তির জায়গা। যদি সে বুক হয় মায়ের।

বাবার। আপনজনের। বলা হয়, বাবা-মায়ের চেয়ে আপন কেউ হয় না। কথাটা সত্য।
তবে এর চেয়ে বড় সত্য হলো, বাবা-মায়ের চেয়ে আমাদের বেশি আপনজন হলেন দয়াল নবীজি (সা.)। বাবা-মায়ের আদরের একটা সীমা আছে। যে সীমার পর বাবা-মা আর আমাদের আদর করতে পারেন না। তখন তারা নিজেকে নিয়ে ভাবেন।

কোরআনে সে সীমার কথা এভাবে বলা হয়েছে, ‘সেদিন মানুষ তার ভাই থেকে পালাবে, তার মা, তার বাবা, তার স্ত্রী ও সন্তান থেকে-প্রত্যেকে সেদিন নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। ’ (সুরা আবাসা, আয়াত ৩৪-৩৭। ) সেদিন কোন দিন?  কেয়ামতের দিন। মজার ব্যাপার সেদিন উম্মতের পাশে এসে দাঁড়াবেন নবীজি (সা.)। গুনাহগার উম্মতকে অভয় দেবেন।

শাফায়াত করে নিশ্চিত জাহান্নামি উম্মতকে উপহার দেবেন জান্নাতের অনাবিল সুখের জীবন।
বলছিলাম, নবীজি (সা.)-এর চেয়ে আপন কেউ হয় না। নবীজি (সা.)-এর  বুকে উম্মতের জন্য যে মায়া জমে আছে সে মায়া আর কারও বুকে নেই। থাকারও কথা না। নবীজি (সা.)-কে পাঠানোই হয়েছে জগতবাসীকে মায়া করার জন্য। রহমত করার জন্য। উম্মত যখন বিপদে পড়ে তখন নবীর মায়ার বুকে আশ্রয় খোঁজে। যে বুকে রয়েছে একসাগর রহমত। নবীজি (সা.) হায়াতে দুনিয়ায় যেভাবে উম্মতের পাশে ছিলেন, হায়াতে বরজখেও তিনি উম্মতের কথা ভোলেননি। তাই তো যখনই বিপদে পড়ে উম্মত নবীজি (সা.)-কে স্মরণ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে নবীজি (সা.) উম্মতের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, ক্ষুধা, অভাব, অনটন, অশান্তিতে দিশাহারা উম্মত নবী (সা.)-এর কাছে পথ চেয়েছেন, নবীজি (সা.) স্বপ্নে উম্মতের পথ সহজ করে দিয়েছেন। অভাব দূর করে দিয়েছেন। অশান্তি চিরতরে দূর হয়ে গেছে। অসুস্থ ব্যক্তি অলৌকিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে স্বপ্নে নবীজি (সা.)-এর ছোঁয়া পেয়ে-এমন উজ্জ্বল ঘটনাও ইতিহাসে পাওয়া যায়। নবীজি (সা.) একবার যাকে শেফা দিয়েছেন পৃথিবীর হায়াতে তার আর কখনো অসুখ হয়নি। তাই আমরা যারা বিভিন্ন মুসিবতে আছি, একবার নবীজি (সা.)-এর কদমে ধরনা দেওয়া প্রয়োজন। বরং বলা চলে, নবীজি (সা.)-এর কদম ছাড়া উম্মতের আসলে যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।

রোগে-শোকে নবীজি (সা.)-এর মায়ার বুকে আশ্রয় নিতেন সাহাবিরা। সাহাবিরা কোনো অসুখে পড়লে আগে যেতেন নবী (সা.)-এর দরবারে। কখনো নবীজি (সা.) বরকতি থুতু দিয়ে চিকিৎসা করতেন, কখনো ঝাড়ফুঁক করতেন, কখনো বা দোয়া করতেন আবার কখনো চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন। খায়বরের যুদ্ধের সময় হজরত আলীর চোখের রোগ ভালো হওয়ার ঘটনা সুপরিচিত। নবীজি (সা.) থুতু দিয়ে আলীর তীব্র চোখের যন্ত্রণা ভালো করে দিয়েছিলেন। একইভাবে হিজরতের সময় আবু বকর (রা.)-কে সাপে কাটলে নবীজি (সা.) থুতু দিয়ে সাপের বিষ নষ্ট করে চিরতরে আবু বকরকে সুস্থ করে দেন।

মুহাদ্দিসগণ বলেন, নবীজির মোজেজা ছিল অসুস্থ ব্যক্তিকে শেফা দেওয়ার। তা সত্ত্বেও কখনো কখনো তিনি সাহাবিদের চিকিৎসা নিতে উৎসাহ দিতেন। এর হিকমত হলো, প্রয়োজনে দুনিয়াবি চিকিৎসা নেওয়া জায়েজ, কখনো কখনো ওয়াজিব, এটা বোঝাতেই তিনি সাহাবিদের চিকিৎসা নিতে উৎস দিতেন। নবীজি (সা.) নিজে যেমন উম্মতকে শেফা করেছেন, আবার শেফা পাওয়ার উপায়ও উম্মতকে শিখিয়ে দিয়েছেন। হাদিসের কিতাবগুলোতে অসুস্থ অবস্থায় পড়ার বিভিন্ন দোয়া পাওয়া যায়। আম্মাজান আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একবার নবীজি (সা.)-এর কোনো স্ত্রী অসুস্থ হয়ে নবীজি (সা.)-এর কাছে এলেন। নবীজি (সা.) ডান হাত তার কপালে রেখে দোয়া করলেন, ‘আল্লাহুম্মা রাব্বান্নাস। মুজহিবাল বাসা, ইশফি আনতাশ শাফি, লা শাফিয়া ইল্লা আনতা, শিয়া আনলা ইউগাদিরা সাকামা। অর্থ : ওগো আল্লাহ! ওগো মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করে দিন। সুস্থতা দিন। আপনিই সুস্থতার মালিক। আপনি ছাড়া কেউ সুস্থ করতে পারে না। এমন সুস্থতা দিন যাতে রোগের কিয়দাংশও অবশিষ্ট না থাকে। ’ (বুখারি, ৫৭৪৩; মুসলিম ২১৯১)। হজরত উসামান বিন আবুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.)-এর কাছে শরীরব্যথার অভিযোগ করা হলে নবীজি (সা.) শেফার জন্য এক পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন। নবীজি (সা.) বলেন, ব্যথার জায়গায় হাত রেখে তিনবার বিসমিল্লাহ বলবে। তারপর সাতবার এ দোয়া পড়বে-আউজু বিল্লাহ, ওয়া কুদরতিহি মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাজিরু। অর্থ : আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি আল্লাহর কাছে, আল্লাহর শক্তির কাছে যে যন্ত্রণা আমি পাচ্ছি তা থেকে। ’ (মুসলিম, ২২০২; আবু দাউদ, ২৮৯১)।   আজ আমরা যারা শারীরিক কিংবা মানসিক যেকোনো রোগে ভুগছি চলুন নবীজি (সা.)-এর রহমতের আশ্রয়ে ফিরে যাই। দোয়ার হাত তুলি। তাঁর শেখানো দোয়া পড়ি, তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করি। আল্লাহর রহমত আসবেই, সুস্থতা, শান্তি মিলবেই। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দিন। আমিন।

লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট