ভুল স্বীকার: নৈতিক শক্তির পরিচয়

ভুল স্বীকার: নৈতিক শক্তির পরিচয়

ছবি: সংগৃহীত

মানুষ মাত্রই ভুলপ্রবণ। কিন্তু ভুলের ওপর অটল থাকা কিংবা নিজের ত্রুটিকে অহংকার দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। ইসলামের শিক্ষা হলো- মানুষ ভুল করলে তা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করবে। ইসলামি দর্শনে ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি উচ্চতর নৈতিক শক্তি, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতির পরিচায়ক।

ভুল হওয়াই মানুষের স্বভাবজাত বাস্তবতা

মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই নিখুঁত নয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে ভুল করা মানুষের একটি স্বাভাবিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রতিটি মানুষই ভুল করে, আর তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ভুলকারী তারাই, যারা ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৪৯৯)

হাদিসে আরও এসেছে, আল্লাহ তাআলা বান্দার অনুতাপ ও তওবাকে এতটাই পছন্দ করেন যে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘ওই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! যদি তোমরা গুনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সরিয়ে এমন জাতিকে সৃষ্টি করতেন যারা গুনাহ করত ও আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা চাইত। আর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন।’ (মেশকাত: ২৩২৮)
এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়- আল্লাহ বান্দার কেবল নিখুঁত হওয়া নয়, বরং তার বিনয় ও ভুলের পর ফিরে আসার মানসিকতাকেও অত্যন্ত মূল্য দেন।

ভুল স্বীকারকারীই কল্যাণে অগ্রগামী

ইসলামি সমাজে ভুল স্বীকারকারীকে হেয় করা হয় না; বরং তাকে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখা হয়। সাহাবায়ে কেরামের জীবন এ বিষয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে ভরপুর। একবার হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত ওমর (রা.)-এর মধ্যে একটি বিষয়ে মতভেদ হয়। আলোচনার একপর্যায়ে আবু বকর (রা.) অনিচ্ছাকৃতভাবে ওমর (রা.)-কে কষ্ট দেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি তৎক্ষণাৎ ওমর (রা.)-এর কাছে ক্ষমা চাইতে যান। পরবর্তীতে ঘটনাটি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি বলেন, ‘তোমাদের এই সঙ্গী আবু বকর কল্যাণে অগ্রগামী।’ (সহিহ বুখারি: ৪৬৪০)
এই ঘটনা প্রমাণ করে, বিবাদের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি আগে নিজের ভুল স্বীকার করে, আল্লাহর কাছে তার গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক বেশি।

ক্ষমা লাভে অপরাধ স্বীকারের গুরুত্ব

যারা অহংকার পরিহার করে নিজেদের অপরাধ অকপটে স্বীকার করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমার দ্বার খুলে দেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘আর অন্য একদল লোক নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে; তারা সৎ কাজের সঙ্গে অসৎ কাজ মিশ্রিত করেছে। আল্লাহ হয়তো তাদের ক্ষমা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা তাওবা: ১০২) নিজের ভুল উপলব্ধি করা ও তা স্বীকার করা সংশোধনের প্রথম ধাপ। বিপরীতে, নিজের ভুলকে আড়াল করা কিংবা তাকে অযৌক্তিকভাবে সঠিক প্রমাণের চেষ্টা করা মানুষকে ধীরে ধীরে আত্মিক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

ক্ষমা চাওয়া যেমন গুণ, ক্ষমা করাও তেমনি মহত্ত্ব

ভুল স্বীকারের মানসিকতা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি অন্যের ভুলকে উদারচিত্তে ক্ষমা করে দেওয়াও মুমিনের বড় গুণ। ইসলামে প্রতিহিংসা নয়, বরং ক্ষমা ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল- আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৪)

ভুল স্বীকার করা নবীদের আদর্শ। হজরত আদম (আ.) ও হজরত ইউনুস (আ.)-সহ বহু নবী নিজেদের ত্রুটির জন্য আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। পক্ষান্তরে, ভুল জেনেও তা নিয়ে অহংকার করা শয়তানি মানসিকতার প্রতিফলন। তাই ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরেও ভুল স্বীকার ও সংশোধনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। এতে ব্যক্তি যেমন আত্মশুদ্ধির পথে এগোয়, তেমনি সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিজের ভুল উপলব্ধি করার, তা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করার এবং সুন্দরভাবে সংশোধন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।