গণভোটের ইতিকথা ১৯৪৭—১৯৯১: ২০২৬ সালে গণভোটের ধন্বন্তরী নতুন দাওয়াই!
মির্জা বাহাদুর, বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।। ছবিঃ সংগৃহীত
এ ভূখণ্ডে '১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত মোট ৫ বার গণভোট অনুষ্টিত হয়েছিল। তবে প্রতিটি গণভোটেই সাধারন জনগণের জন্য একটি মাত্র প্রশ্ন ছিল। প্রতিটি গণভোটেই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ অথবা না বাক্সে দেয়ার অপশন ছিল আর এটাই চিরাচরিত প্রথা।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অনুরূপ নিয়ম অনুসরণ করা প্রচলিত রয়েছে। তাছাড়া আমরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ণকালিন একটি প্রশ্নের উত্তর অনুরূপ হ্যাঁ/না দিয়ে মীমাংশা করা হতো। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ৬ ও ৭ জুলাই প্রথম গণভোট অনুষ্টিত হয়েছিল। প্রশ্ন ছিল "সিলেট জেলা (করিমগঞ্জ মহকুমা ব্যতীত) আসাম, ভারত নাকি পূর্ব বাংলার অধীনে থাকবে? গণভোটে সিলেট জেলা পূর্ব বাংলার অধীনে থাকার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ রায় দিলে যথাযথ সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় এবং সিলেট জেলা পাকিস্তানের অধীনে অন্তর্ভূক্ত হয়।
১৯৬০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার ক্ষমতা ৫ বছর বাড়ানোর জন্য হ্যাঁ/না ভোটের আয়োজন করেন। মৌলিক গণতন্ত্রের ৮০ হাজার ভোটার (ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও মেম্বার গন) জাল টাকা নিয়ে 'হ্যাঁ' দিয়ে আইয়ুব খানের মসনদ ৫ বছর দীর্ঘায়িত করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম গণভোট অনুষ্টিত হয়েছিল। গণভোটে প্রশ্ন ছিল "দেশ রাষ্ট্রপতির শাসন ব্যবস্থায় ফিরবে কি না?" হ্যাঁ অথবা না ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল তবে এতে জনগণের আগ্রহ না থাকলেও গণভোটে হ্যাঁ জয় যুক্ত হয়েছিল। ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ বাংলাদেশে দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্টিত হয়েছিল। প্রশ্ন ছিল "দেশ কি সামরিক শাসন ব্যবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তিত হবে কিনা?" গণভোটে জনগণের আগ্রহ না থাকলেও পুরানো পদ্ধতিতে নিয়ম রক্ষার স্বার্থে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে জয় যুক্ত করা হয়। ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর শেষ বারের মতো গণভোট অনুষ্টিত হয়েছিল। উক্ত গণভোটে প্রশ্ন ছিল "সংবিধানে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্ত হবে কি না? নির্বাচনে হ্যাঁ জয় যুক্ত হয়েছিল।
বিগত চারটি গণভোটের সাথে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্টিতব্য গণভোটের সবচেয়ে বড় ফাড়াক হলো গণভোটের জন্য জনগণের নিকট উত্থাপিত প্রশ্নমালা? বিগত সময়ে প্রতিটি গণভোটে একটি মাত্র প্রশ্নের বিপরীতে ভোট দেয়ার অপশন থাকলেও আগামী গণভোটে প্রশ্ন সংখ্যা ৪ টি যা সম্পূর্ণ নতুন ও হাস্যকর। কেননা দেশের সকল জনগণ কোনক্রমেই একত্রে ৪ টি প্রশ্নের উত্তরে শুধুমাত্র হ্যাঁ অথবা না তে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যে কেউ একটি অথবা দুইটি অথবা তিনটি অথবা চারটি শর্ত মানতে পারেন সেখানে সকলকে একত্রে চারটি শর্তের পক্ষে ভোট দেয়ার নিয়ম এক ধরণের বল প্রয়োগ যেমন; অনেকটা নাক চেপে শিশুদের ধন্বন্তরী দাওয়াই খাওয়ানোর মতো এক ধরণের কৌশলই বটে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল মানে থাইল্যাণ্ডে আজ যে গণভোট চলছে সেখানেও একটি মাত্র প্রশ্ন ছিল আর তা হলো পুরাতন সংবিধান বলবৎ থাকবে নাকি নতুন করে সংবিধান রচিত হবে? উত্তর হ্যাঁ অথবা না।
তাই রাষ্ট্রীয় কোন প্রথা বা আইন জোড় করে জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া গণতন্ত্রের মাপকাঠিতে কতটা যুক্তিযুক্ত তা কেবল সংবিধান বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে এতটুকু ধারণায় নেয়া অযৌক্তিক নয় তা হলো নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর কেউ যদি উচ্চ আদালতে অত্র গণভোটের বিরুদ্ধে রিট করেন হয়তো গণভোটে ফলাফল পরিবর্তন অসম্ভব নয়। কারন ড. মুনতাসীর মামুন ভেবে চিন্তে লিখেছিলেন "সব সম্ভবের দেশ: বাংলাদেশ।"
মির্জা বাহাদুর,
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট