কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় খাল–নদী খননের দাবি ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকদের
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হলেও নদী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর নাব্যতা ও স্বাভাবিক গতিপথ, ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল–বিল। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি ও পরিবেশে। কৃষিনির্ভর জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে খাল ও নদী পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
স্থানীয়দের মতে, একসময় ঠাকুরগাঁও জেলায় ৩৬টি নদ–নদীর প্রবাহ ছিল। বর্তমানে দৃশ্যমান রয়েছে মাত্র সাত থেকে আটটি নদী। তাও নেই আগের মতো নাব্যতা কিংবা স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ। নদী শাসনের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর গতিপথ এবং পরিবেশ পড়ছে হুমকির মুখে।
২০১৮–১৯ অর্থবছরে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং কৃষিকাজে নদীর পানি ব্যবহারের লক্ষ্যে জেলায় সাতটি নদী ও একটি খাল খনন করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৮০ কোটির বেশি টাকা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত খননের কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই নদীগুলো আবার ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও জেগে উঠেছে চর, কোথাও নদীর বুকে চলছে চাষাবাদ। অধিকাংশ খাল সংস্কার না হওয়ায় বর্ষার পানি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে খরার মৌসুমে সেচের জন্য সেলো মেশিনই এখন কৃষকদের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় এবং কমছে লাভের পরিমাণ।
সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল সালাম বলেন, খাল ও নদীতে পানি না থাকায় সেচ দিতে অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে খাল ও নদী পুনঃখনন করে বর্ষার পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে খরা মৌসুমে সেচ সংকট অনেকটাই কমবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং ফসল ও মাছ উৎপাদন বাড়বে।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বোরো মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। খাল খনন করে পানি ধরে রাখা গেলে মাটির নিচের পানির স্তরে পুনরায় পানি জমা হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি রক্ষায় সহায়ক হবে।
নারগুন এলাকার কৃষক হাসিবুল জানান, বর্ষা মৌসুমে নদী ও খালের নাব্যতা না থাকায় পানি উপচে ফসলি জমি তলিয়ে যায়। খনন না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই ধান ও সবজির খেত নষ্ট হয়ে যায়। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকলে কৃষকদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
মৎস্যজীবী খাদেমুল ইসলাম বলেন, নদী ও খাল খনন করা হলে কৃষির পাশাপাশি দেশি মাছ চাষের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি খরা মৌসুমে গবাদিপশুর জন্যও পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
পরিবেশকর্মী শাহজাহান মিয়া বলেন, জেলার অনেক খালের পাড় প্রভাবশালীরা দখল করে আবাদি জমিতে পরিণত করেছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে খালের সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ দখল উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঠাকুরগাঁও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, সারাদেশে খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে জেলায় ২৪টি নদী ও খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, নদী ও খাল খনন করা হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমবে এবং খরা মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উন্নত করা সম্ভব হবে। এতে সেচকাজে জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং আবাদি জমির পরিমাণ বাড়বে।