ঐতিহাসিক আরব বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল
ফাইল ছবি
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরব জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জোরালো হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের ভূখণ্ডে একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এই স্বপ্ন ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় ইতিহাসখ্যাত আরব বিদ্রোহ।
১৯১৬ সালের জুন মাসে মক্কার শাসক শরিফ হোসেনের নেতৃত্বে আরব বাহিনী অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহের সূচনা করে। এই বিদ্রোহ মূলত হেজাজ অঞ্চল থেকেই শুরু হয় এবং এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সেখানে দীর্ঘদিনের অটোমান কর্তৃত্বের অবসান ঘটানো। হেজাজে অটোমান শাসনের পতন ঘটানোর লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর বিদ্রোহের পরিধি আরো বিস্তৃত হয় এবং তা লেভান্ট অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আরব বাহিনী সেখানে অবস্থানরত অবশিষ্ট অটোমান সেনাদের বিতাড়িত করার অভিযান চালায়।
ক্রমে এই আন্দোলন একটি বৃহত্তর মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। এর ফলে সিরিয়া, ইরাকসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল অটোমান শাসনের কবল থেকে মুক্ত হতে সক্ষম হয়। আরব বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল আরব উপদ্বীপ ও বৃহত্তর সিরিয়া বা লেভান্ট অঞ্চলের আরবভূমিগুলোকে একত্র করে একটি স্বাধীন আরব ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা। তবে এই পরিকল্পনার বাইরে রাখা হয়েছিল আদানা অঞ্চল এবং বাগদাদ থেকে উপসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ইরাকের কিছু এলাকা।
এভাবে আরব বিদ্রোহ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরব জাতীয়তাবাদের বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে।
আরব বিদ্রোহের কারণ : অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ যুগে মধ্যপ্রাচ্যের আরব অঞ্চলগুলোতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ক্রমেই বাড়তে থাকে, বিশেষ করে তুর্কি শাসকগোষ্ঠীর কঠোর নীতি ও কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা আরব জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এরই প্রেক্ষাপটে আরবদের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা ১৯১৬ সালের আরব বিদ্রোহে রূপ নেয়। এই বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তুর্কি শাসকদের ‘তুর্কিকরণ নীতি’। এই নীতির মাধ্যমে অটোমান শাসকরা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে তুর্কি সংস্কৃতি ও ভাষার অধীন করতে চেয়েছিল।
কিন্তু এই নীতি আরব জনগণের জন্য ছিল অন্যায্য ও দমনমূলক। এর ফলে আরবদের রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও হুমকির মুখে পড়ে। এই তুর্কিকরণ নীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—
১. ভাষাগত দমননীতি : আরবদের নিজেদের মাতৃভাষা আরবি ব্যবহারে বাধা দেওয়া হতো এবং প্রশাসন ও সরকারি ক্ষেত্রে তুর্কি ভাষা ব্যবহারে তাদের বাধ্য করা হতো। ফলে আরবদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংকুচিত হয়ে পড়ে।
২. অর্থনৈতিক অবনতি : অটোমান শাসনের শেষ পর্যায়ে আরব অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। বাণিজ্য ও কৃষি ব্যবস্থায় সংকট দেখা দেয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে এবং দারিদ্র্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. আরব নবজাগরণের দমন : ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আরব সমাজে যে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নবজাগরণ শুরু হয়েছিল, তুর্কি শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন নীতির মাধ্যমে তা দমন করার চেষ্টা করে। ফলে আরব বুদ্ধিজীবী ও তরুণ সমাজের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
৪. বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান সরকার আরব যুবকদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা চালু করে। এতে বহু আরবকে দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়, যা তাদের পরিবার ও সমাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং শাসনের প্রতি ক্ষোভ বাড়ায়।
৫. ১৯১৫ সালের দুর্ভিক্ষ : যুদ্ধকালীন অবরোধ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে ১৯১৫ সালে লেভান্ট অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ দুর্ভোগে পড়ে এবং বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই দুর্ভিক্ষও অটোমান শাসনের প্রতি আরবদের ক্ষোভকে আরো তীব্র করে তোলে। এসব রাজনৈতিক দমন, সাংস্কৃতিক সংকোচন, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং মানবিক সংকটের সমষ্টিগত প্রভাবেই আরব সমাজে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। শেষ পর্যন্ত এই অসন্তোষই ১৯১৬ সালের ঐতিহাসিক আরব বিদ্রোহে রূপ নেয়।
ঐতিহাসিক আরব বিদ্রোহের ফলাফল : ১৯১৬ সালের আরব বিদ্রোহ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে। অটোমান সাম্রাজ্যের দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনের ফলে আরব অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। এই বিদ্রোহের একটি উল্লেখযোগ্য ফল ছিল আরব উপদ্বীপ ও লেভান্ট অঞ্চল থেকে অটোমান শাসনের অবসান। আরব নেতারা এই বিজয়ের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্ন পূরণ সহজ ছিল না। কেননা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করে এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী অঞ্চলগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা সামরিক প্রশাসনের অধীনে আরব ভূখণ্ডকে তিনটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত করে। দক্ষিণ অংশ সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে রাখা হয়। উত্তরাঞ্চল শরিফ হুসেনের পুত্র ফয়সালের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, আর পশ্চিমাঞ্চল ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি আরো বদলে যায়। ফরাসি বাহিনী সিরিয়া অঞ্চলে আক্রমণ চালালে সেখানে প্রতিষ্ঠিত আরব শাসনের অবসান ঘটে এবং সিরিয়ায় ফরাসি ম্যান্ডেট শাসন শুরু হয়। একই সময়ে ফিলিস্তিন, ইরাক এবং ট্রান্সজর্দান অঞ্চলের ওপর ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এদিকে সিরিয়া থেকে ফয়সালকে অপসারণের পর নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যায়। শরিফ হুসেনের আরেক পুত্র আবদুল্লাহ ব্রিটিশ সমর্থনে ট্রান্সজর্দান অঞ্চলে নিজের নেতৃত্বে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এর ফলেই ট্রান্সজর্দান আমিরাতের সূচনা হয়, যা পরবর্তীকালে জর্দান রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এভাবে একদিকে অটোমান শাসনের অবসান ঘটালেও অন্যদিকে ঐতিহাসিক আরব বিদ্রোহ মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নতুন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথও উন্মুক্ত করে দেয়। ফলে আরবদের প্রত্যাশিত পূর্ণ স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র তখন বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।