একাত্তরকে অস্বীকারের রাজনীতি মেনে নেওয়া যাবে না

একাত্তরকে অস্বীকারের রাজনীতি মেনে নেওয়া যাবে না

সংগ্রহীত ছবি

এবারের স্বাধীনতা দিবস অনেকটাই স্বস্তিকর পরিবেশে উদযাপন হতে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দলের পরাজয়ের পর এবারের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হতে যাচ্ছে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি আলবদর, আলশামস আর রাজাকারদের পৃষ্ঠপোষক একটি দল গত দেড় বছরে আমাদের আবার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল, দেশে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের অবস্থান এখনো বহাল রয়েছে। দেশের একটা ক্রাইসিসের মধ্যে মাথা উঁচু করে তারা নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছিল।

আমরা কিন্তু তাদের এক্সেপ্ট করে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এই দলটিতে আজ যারা রয়েছে, ব্যক্তি হিসেবে তারা তো সেদিন অপরাধ করেনি। আমরা ভেবেছিলাম, যারা এখন সেই দল করে, তাদের জন্ম তো একাত্তরের পরে। তারা হয়তো নতুনভাবে এই দেশটাকে গ্রহণ করবে; কিন্তু তারা একাত্তরকেই অস্বীকার করতে চায়।

তারা ১৯৪৭ থেকে শুরু করে একাত্তর বাদ দিয়ে ২০২৪-এ আসতে চায়। আমার বাংলাদেশের জন্মই একাত্তরে। সেই বাংলাদেশে একাত্তরকে অস্বীকার করে রাজনীতি করতে চাওয়া মেনে নেওয়া যায় না, যাবে না। একাত্তরকে অস্বীকার করা মানেই নিজের মাকে, মাতৃভূমিকে অস্বীকার করা।

তাদের দল আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল, আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং পাকিস্তান আর্মিকে, হানাদারদের সব রকম সাহায্য তারা করেছিল। আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছিল, আমাদের মা-বোনদের পাকিস্তানিদের হাতে ধর্ষিত হওয়ার জন্য তুলে দিয়েছিল। সেই অপশক্তিকে আমরা যখন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর আবার সেই দিনের মানসিকতায় ফেরত যেতে দেখি। তখন মনে হয়েছিল—এরা এ দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আবারও মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। এ দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।

 একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এটা আমাদের জন্য ছিল চরম হতাশার ও ক্ষোভের।

আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি, স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের ছবি মাটির মধ্যে ফেলে তাদের অনুসারী ছাত্ররা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পা দিয়ে পাড়াল, অপমান করল। তারপর তারা তাদের জোটে যোগ দেওয়ার পর কর্নেল অলি সম্পর্কে কী বলেছিল সেটাও জেনেছি। তারা বলল, কর্নেল অলি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নতুন করে এই তর্কটা শুরু করল, এই কনসপিরেসিটা দরকার ছিল না। আমরা যারা যুদ্ধ করেছি, আমাদের বয়সী যত লোক আছে, তারা সবাই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই ঘোষণা শুনেছি এবং শুনে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছি। সেই ঘোষণার মাধ্যমেই তো মুক্তিযুদ্ধের সূচনা।

এসব কন্ট্রোভার্সি করে তারা এই দেশ পরিচালনা করবে এটা কি হয়? দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন জনাব তারেক রহমান। উনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান। উনার একটা গণ্ডির বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বেগম জিয়া দেশে গণতন্ত্রের জন্য চেষ্টা করেছেন অনেক দিন, গণতন্ত্রের জন্য উনি করেননি এমন কোনো বিষয় নেই। উনি আমাদের দেশের প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে আমাদের শহীদরা যাঁরা আত্মত্যাগ করেছেন, যাঁরা ২০২৪-এ স্বৈরাচার সরানোর আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন—এই আবু সাঈদ, মুগ্ধ আর ওয়াসিমরা, তাঁদের আত্মা শান্তি পাবে যখন এই গণতান্ত্রিক ধারাটা চলবে।

গত দেড় বছরে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। উনি রাজনীতিবিদও না, আর হিস্টোরিয়ানও না। একদিকে আমি অ্যাপ্রিশিয়েট করি, উনার যে মর্যাদা সারা পৃথিবীতে, সেটা দিয়ে উনি আমাদের বাঁচিয়ে দিয়ে গেছেন, যাতে ভারত সুযোগ নিতে না পারে। কিন্তু উনি এই দেড় বছর খুব সুন্দরভাবে সরকার পরিচালনা করতে পারেননি। কারণ উনি ভালো অ্যাডমিনিস্ট্রেটর নন। তবে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন উনি দিয়ে গেছেন এবং দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় অর্জিত হয়েছে।

এর আগে গত দেড় বছর ধরে যখন একাত্তরকে উপেক্ষা করার অপচেষ্টা হচ্ছিল, তখন আমরা মানসিকভাবে খুবই বিধ্বস্ত ছিলাম। আমরা তো ভাবতেই পারিনি—’৭১-এর পরাজিত শক্তি আবারও এমন মনোভাব রাখবে। আমরা গত দেড় বছর কিসের মধ্যে দিয়ে গিয়েছি! একটি পক্ষ সকালে এক কথা বলেছে, বিকেলে এক কথা বলেছে। তারা চেষ্টা করেছে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনা তো হঠাৎ করে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধটা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওটা ছাড়া আমাদের আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তান কোনো সময় আমাদের বাংলাদেশ তথা এই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে সমান মনে করত না। যে কারণেই যুদ্ধের শুরু। বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতিবিদদের চেয়ে এগিয়ে ছিল এই দিকে যে, তারা পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে না, স্বাধীনতাই আমাদের কাম্য—যদি না ১৯৭০-এর নির্বাচনটা তারা না মেনে নেয়। এই মার্চ মাসে বিরাট রকমভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তন এলো, উত্তপ্ত হয়ে গেল বাংলাদেশ। মার্চের ২ তারিখ আ স ম আব্দুর রব পতাকা ওড়ালেন। পরদিন শাজাহান সিরাজ ইশতেহার পাঠ করলেন। ৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমান একটা বক্তৃতা দিলেন, খুব ভালো বক্তৃতা, দারুণ বক্তৃতা, সারা বাংলাদেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল। কিন্তু ফাইনালের হুইসেল বাজল না, স্বাধীনতা ডিক্লেয়ার করলেন না উনি। যেটা জনসাধারণ চেয়েছিল, ছাত্রনেতারা চেয়েছিলেন, আমরা সবাই চেয়েছিলাম। তো এই অবস্থায় ৭ মার্চ পার হলো। সময়ক্ষেপণ করার জন্য ইয়াহিয়া খান সংলাপের প্রস্তাব দিলেন।

এই সংলাপ ১৩ তারিখে শুরু হয় এবং ২৩ তারিখ পর্যন্ত কথাবার্তা চালায়। সাংবাদিকরা ফেডআপ হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সংলাপের অগ্রগতি কিছু হচ্ছে কি না? তখন উনি (শেখ মুজিবুর রহমান) বলেছিলেন, আমি কি ঘাস কাটছি, অগ্রগতি না হলে কি আমি এর মধ্যে সময় দিচ্ছি? কিন্তু উনি জানতেন, কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। ২৩ তারিখে এই সংলাপ ভেঙে যায় এবং এর মধ্যে ভুট্টোও এসেছিলেন ২৩ তারিখে। ২৪ তারিখে তিনিও চলে যান গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে। শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলে আমরা অনেকটা অসহায় হয়ে গেলাম। পাকিস্তান আর্মি চলে এলো, শেলিং করল ইত্তেফাক অফিসে। একগাদা লোক ইত্তেফাক ভবনের পাশেই আমাদের বাড়ির ওপর দিয়ে জাম্প দিয়ে পেছন দিকে ঢাকেশ্বরী মিলের দিকে চলে গেল। সেই রাতটা গোলাগুলির মধ্যে আমাদের বাসার মধ্যে কাটালাম, আর আমরা বিবিসি শুনছি, ভয়েস অব আমেরিকা শুনছি। তারপরের দিন ২৬ তারিখ কারফিউ ছিল। ভয়ভীতির মধ্যে কাটালাম। ২৭ তারিখ সকালে কারফিউ ওঠানো হলো। কারফিউ ওঠানোর পর আমরা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেলাম কোথায় কি হচ্ছে দেখতে। আমরা তো তখনো পাকিস্তানের বাসিন্দা। ঘাটে গিয়ে দেখলাম লাশ আর লাশ পড়ে আছে। ওখান থেকে গেলাম শাঁখারীপট্টি, সেখানেও অমানবিক সব দৃশ্য। ২৭ তারিখ সকালে জগন্নাথ হলে গেলাম ওখানেও পাকিস্তান আর্মি গুলি করে মানুষ মেরেছে। এই বর্বরতা চালানো হয় নিরস্ত্র নিরপরাধ ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর। রাস্তায় যাদের মেরেছে তারা সব তৃণমূলের মানুষ—রিকশাওয়ালা, দিনমজুর। তখন আমার মনে একটা ভাবনা এলো, আমরা আর পাকিস্তানে নেই, আমরা এখন বাংলাদেশ পেয়ে গেছি। কিন্তু সেটা কিভাবে হবে বা কবে হবে জানি না। বাসায় আসার পর রেডিওতে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম, ‘দিস ইজ জিয়াউর রহমান। আই ডিক্লিয়ার ইনডিপেনডেন্স অব বাংলাদেশ অ্যান্ড উই উইল ফাইট আনটিল দ্য পাকিস্তান আর্মি ইজ নট রিমুভ ফ্রম দিজ সয়েল।’ আমাদের দেশের মাটির থেকে শেষ পাকিস্তানি সোলজারটা বিতাড়িত না করা পর্যন্ত আমাদের যুদ্ধ চলবে—এই যে একটা আওয়াজ এলো, এত অত্যাচারের পর আমরা একটা দিকনির্দেশনা পেলাম। আমরা একটা ধ্রুবতারা দেখলাম আকাশের মধ্যে এবং আমরা যুদ্ধে যাওয়ার ঠিকানা পেলাম। তখন অল্প বয়স, যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। আমরা চার ভাই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বের হয়ে গেলাম।

যখন ঢাকা শহরে পাকিস্তান আর্মি অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে দিয়েছে এবং হাজার হাজার বাঙালিকে মেরে ফেলেছে, সেই খবর উনার (জিয়াউর রহমান) কাছে যাওয়ার পর উনি তাৎক্ষণিক ডিসিশন নিয়েছেন যে উনি প্রতিবাদ করবেন। স্বাধীনতার এই চাওয়াটা সোলজারদের সঙ্গে ইন্টারেক্ট হওয়াটা ২৫ তারিখ রাতে। ওটাই হচ্ছে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা। তখন উনি ঘড়ির দিকে তাকিয়েছিলেন, রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট, অর্থাৎ ২৬ তারিখ ভোর। তখন উনি প্রথম ঘোষণাটা দেন। তারপর কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। প্রথমে নিজের নামে দেন, পরে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে।

একাত্তরের ২৫ মার্চ যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের শেষ, সেখানে জিয়াউর রহমানের শুরু। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা আমাদের নতুন করে উজ্জীবিত করল। উনি সম্মুখ যুদ্ধে থাকতেন এবং বাংকারে বাংকারে গিয়ে সবাইকে উজ্জীবিত করতেন। উনি শুধু স্বাধীনতার ঘোষণাই দেননি, উনি ওয়ান অব দ্য মোস্ট অ্যাক্টিভ সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। উনার নামে জেড ফোর্স হয়েছিল এবং উনি ১৯৭১-এ যুদ্ধ করে আহত হয়েছিলেন। এটা কোনো সাধারণ যুদ্ধ ছিল না, এটা ছিল একটা জনযুদ্ধ। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও এই ঘোষণাটাকে স্বীকৃতি দিতে চায়নি। সেক্টর কমান্ডাররা ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে একত্র হয়ে মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা করেন এবং দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করেন। জিয়াউর রহমান যুদ্ধ শুরু করলেন এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উনি আবার সেনাবাহিনীতে ফিরে গেলেন। উনি কোনো দিন বলেননি যে আমি দেশের স্বাধীনতার ঘোষক। উনাকে যখন সারপাস করে সফিউল্লাহকে আর্মি চিফ করা হলো, তখনো উনি প্রতিবাদ করেননি। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর জনগণ এবং সৈনিকরা তাঁকে পছন্দ করে দেশের হাল ধরতে বললেন।

দেশ স্বাধীন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, রাজনীতির মাধ্যমে নয়। এ জন্য তারা (আওয়ামী লীগ) মুক্তিযুদ্ধটাকে সাইড করতে চাইল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সঠিক তালিকা রাখা হলো না। আমি যে কথাগুলো বলছি এগুলো কাল্পনিক নয়, এগুলো ইতিহাসের অংশ। আজ এত বছর পরে বিএনপি আবার সরকার গঠন করেছে। আমরা আশা করব, ’৭১-এ যারা শহীদ হয়েছেন এবং ২০২৪-এ যারা শহীদ হয়েছেন (আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম), তাঁদের আত্মার তৃপ্তি হবে—যদি এই দেশটা সুন্দরভাবে চলে।

[ইশতিয়াক আজিজ উলফাত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকায় অভিযান চালানো গেরিলা দল ক্রাকপ্লাটুনের অন্যতম সদস্য। তাঁর ভাই আবু মঈন আশফাকুস সামাদ বীর-উত্তম মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। ছেলেদের মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগে বাবা আজিজুস সামাদকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বর্তমানে তিনি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি।]