মণিপুরিদের প্রাচীন ঐতিহ্যের উৎসব ‘লাই হারাওবা’
সংগৃহীত ছবি
খোলা মাঠ পেরিয়ে দমকা হাওয়ার ঝাপটায় দুলছে গাছের শাখা-প্রশাখা। বৈশাখের ভ্যাপসা গরমকে দূরে সরিয়ে এনে দিয়েছে এক স্বস্তির বিকেল। সেই মনোরম পরিবেশেই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের তেতইগাঁওয়ের মণিপুরি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে বসে প্রাচীন ঐতিহ্যের উৎসব ‘লাই হারাওবা’।
বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ পথ ধরে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, শিশু—সবাই যেন উৎসবের রঙে রঙিন। কিশোরী ও তরুণীদের খোঁপায় ময়ূরের পেখম, নৃত্যে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি স্পষ্ট। মাঠজুড়ে বসে ভ্রাম্যমাণ দোকান; খেলনা, প্রসাধনী আর পেঁয়াজু, বেগুনি, ঝালমুড়িসহ নানা খাবারের সমাহার উৎসবকে করে তোলে প্রাণবন্ত।
তিনদিনব্যাপী এই উৎসবের শেষ দিনে বিকেল থেকেই জমে ওঠে আয়োজন।
শামিয়ানার নিচে দর্শকের ভিড় বাড়ে, আর কুশীলবরা প্রস্তুত হন পরিবেশনার জন্য। ঢোল-খোল, বাঁশিসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর হয়ে ওঠে প্রাঙ্গণ। সন্ধ্যা নামতেই উন্মুক্ত মঞ্চে শুরু হয় নৃত্যপর্ব। নারী, কিশোরী ও শিশুদের অংশগ্রহণে মঞ্চ যেন জলতরঙ্গের মতো দুলে ওঠে।
সুর, তাল ও মুদ্রার মূর্ছনায় সন্ধ্যা ডুবে যায় এক স্নিগ্ধ, প্রার্থনাময় আবহে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকেলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের তেতইগাঁওয়ে অবস্থিত মণিপুরি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে এমন ভিড় জমেছিল। বুধবার এই উৎসব শুরু হয়। এর পর থেকে চলছে নানা আচার-অনুষ্ঠান। শেষ হয় শুক্রবার।
এতে অর্থায়ন করেছে ইউনেস্কো বাংলাদেশ, উৎসব বাস্তবায়নে ছিল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।
বিকেলটা ঘনিয়ে আসতে থাকলে জমে ওঠে মণিপুরি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণ। ক্রমে শ্রোতা-দর্শকে পূর্ণ হয়ে ওঠে শামিয়ানার নিচে পেতে রাখা খালি চেয়ারগুলো। আচার-অনুষ্ঠান, নাচে অংশ নিতে কুশীলবেরাও সক্রিয়, সচল হয়ে ওঠেন। ঢোল-খোল, বাঁশিসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুর বেজে ওঠে, প্রাঙ্গণজুড়ে চলতে থাকে সুরের ঝংকার। বাইরে সন্ধ্যার আঁধার নামলে উন্মুক্ত মঞ্চে উপস্থিত হন সমবেত শিল্পীরা। ক্রমে নারী, তরুণী ও শিশু-কিশোরীরা নৃত্যে অংশ নিতে থাকেন। গান ও সুরের তালে, নানা মুদ্রায় দীর্ঘ সময় ধরে নাচ চলতে থাকে। একটা সময় অনেকজনের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত মঞ্চটি জলতরঙ্গের মতো দুলতে থাকে, ভাসতে থাকে। একদিকে খোলা হাওয়া, অন্যদিকে গান ও সুরের মূর্ছনা সন্ধ্যাটিকে প্রার্থনার মতো স্নিগ্ধ মুগ্ধতায় ডুবিয়ে রাখে।
আয়োজকদের মতে, লাই হারাওবা’ মণিপুরি জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র উৎসব। ‘লাই’ অর্থ দেবতা, ‘হারাওবা’ আনন্দ—অর্থাৎ দেবতাদের আনন্দোৎসব। এর কেন্দ্রবিন্দু ‘লাই হারাওবা জগোই’, যা মণিপুরি নৃত্যের আদিরূপ হিসেবে বিবেচিত। এই নৃত্যের মাধ্যমে মাইবি (নারী পুরোহিত) দেবতাদের সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রকৃতি ও মানবজীবনের নানা পর্যায় তুলে ধরেন।
স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য রবি কিরণ সিনহা (রাজেশ) জানান, এই উৎসব মণিপুরি সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিচয়ের প্রাণকেন্দ্র, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান।
লাই হারাওবা স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যসচিব ওইমান লানথই বলেন, এটি মণিপুরি জনগোষ্ঠীর এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যা প্রাচীন মেইতেই সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এবং প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্ককে ধারণ করে।
অন্যদিকে আহ্বায়ক ইবুংহাল সিনহা (শ্যামল) বলেন, মাইবিদের নৃত্য এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ, যার মাধ্যমে পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা, আধ্যাত্মিক চর্চা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়।
ইউনেসকো বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সহায়তায় আয়োজিত এই উৎসব শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।