ইউক্রেনের হয়ে যুদ্ধ করছে রোবট, চ্যালেঞ্জের মুখে রাশিয়া

ইউক্রেনের হয়ে যুদ্ধ করছে রোবট, চ্যালেঞ্জের মুখে রাশিয়া

ছবি: সংগৃহীত

চারদিকে ধুলোর ঝড়, সাইরেনের আর্তনাদ, ঝাপসা স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ডের বিরতি এবং তার পরেই এক বিধ্বংসী বিস্ফোরণ। মাটির নিচের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাইলের পর মাইল দূরে বসে ‘গেমার চেয়ার’ এ হেলান দিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখছেন ইউক্রেনের যুদ্ধজয়ী সেনারা।

ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধক্ষেত্র এখন আর কেবল রক্তমাংসের সৈন্যদের লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সেখানে মানুষের স্থান দখল করে নিচ্ছে অত্যাধুনিক সব রোবট ও চালকবিহীন বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তি। যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারির রক্তক্ষয়ী লড়াই থেকে দূরে থেকে কমান্ডাররা এখন স্ক্রিন, লাইভস্ট্রিম এবং ড্রোনের মাধ্যমে হামলা পরিচালনা করছেন।

পূর্ব ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে তিনটি রুশ অবস্থান লক্ষ্য করে ছয়টি বড় বিস্ফোরণের একটি সম্পূর্ণ মিশন পরিচালিত হয়েছে কোনো মানুষের উপস্থিতি ছাড়াই; যার গতিপথ নির্ধারিত হচ্ছে স্ক্রিনে এবং নজরদারি চালানো হচ্ছে মাথার ওপরে থাকা ড্রোন দিয়ে।

জনবল সংকট এবং পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে সামরিক সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে ইউক্রেন দ্রুত তাদের চালকবিহীন যুদ্ধ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। এই প্রযুক্তিগত সুবিধা তাদের রাশিয়ার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে রাখছে।

গত এপ্রিলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, তার বাহিনী প্রথমবারের মতো কেবল রোবট ও ড্রোনের সহায়তায় রাশিয়ার একটি ঘাঁটি দখল করতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি আরও জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইউক্রেনের চালকবিহীন ব্যবস্থাগুলো প্রায় ২২ হাজার সফল মিশন পরিচালনা করেছে।

ইউক্রেনীয় বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে আটক হওয়া রুশ সেনারা এই বিস্ফোরকবাহী রোবটগুলোর নাম দিয়েছে—‘নীরব মৃত্যু’। এই রোবটগুলো এতটাই নিঃশব্দে চলাচল করে যে, রুশ সেনারা সাধারণত এগুলো ১০ মিটারের মধ্যে আসার আগে টের পায় না, যখন তারা ইতোমধ্যেই বিস্ফোরণের সীমানার মধ্যে চলে আসে।

ইউক্রেনের থার্ড অ্যাসাল্ট ব্রিগেডের ‘এনসি১৩’ ইউনিট হিসাব করে দেখেছে, গত ১৬৪টি অভিযানে তারা এই রোবটগুলোর মাধ্যমে যে সাফল্য পেয়েছে, সমপরিমাণ কাজের জন্য তাদের অন্তত ২৩০০ সেনার প্রয়োজন হতো। এ ধরনের হামলায় সাধারণত ইউনিটের অর্ধেক সেনা নিহত বা আহত হয়। সেই হিসাবে স্ক্রিনের সামনে ধীরগতিতে চলা এই বোমাবাহী রোবটগুলো অন্তত এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার জীবন বাঁচিয়েছে।

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে যারা এক সময়ে রণাঙ্গনে সম্মুখসারিতে যুদ্ধ করতেন, সেই কমান্ডারদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের এই রূপান্তর এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। 

ডনবাসের লড়াইয়ে অংশ নেওয়া ইউক্রেনের একজন ডেপুটি কমান্ডার বার বলেন, আমি তখন এমন কিছু কল্পনাও করতে পারিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি যে সেই সময় আমাদের কাছে এই ধরনের সরঞ্জাম থাকলে আমার আরও অনেক সহযোদ্ধা বেঁচে যেত।

ইউক্রেনের খারকিভ অঞ্চলের একটি ওয়ার্কশপে আনম্যানড গ্রাউন্ড ভেহিকল মেরামত করছেন লাভা আনম্যানড সিস্টেমস রেজিমেন্টের সদস্যরা / ছবি: ডিয়েগো ফেদেলে/গেটি
তবে এই ইউনিটের কমান্ডার মাইকোলা মাকার জিনকেভিচের কাছে এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্র কিছুটা শূন্য মনে হয়। তিনি বলেন, তখনকার দিনে যুদ্ধ এক রকম আরও বেশি— কী বলব, পুরুষালি ছিল। সেখানে আপনার দক্ষতাই ছিল আসল বিষয়— কেমন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, কতটা শৃঙ্খলা মেনে চলছেন ইত্যাদি। এখন প্রযুক্তিই সবকিছু নির্ধারণ করে। আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই।  এটি এখন কেবল একটি প্রতিযোগিতা— চালকবিহীন এই মৃত্যুর খেলায় কে কত দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

ইউক্রেনের এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর মূলত বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে। রাশিয়ার দীর্ঘ চার বছরের আগ্রাসনে দেশটির ছোট জনসংখ্যা ইতোমধ্যেই এক বড় মানবিক বিপর্যয় ও ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তবে কিয়েভের ড্রোনের প্রাথমিক ব্যবহার এবং সেগুলোর নির্ভুল ক্ষমতা মস্কোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে।

ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এখন প্রতি মাসে প্রায় ৩৫ হাজার রুশ সৈন্যকে হতাহত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন, যা চলতি বছর সফলভাবে বজায় রাখা হয়েছে বলে তাদের দাবি। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রেমলিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা রাশিয়ার বড় বড় শহর এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে লোক নিয়োগ করতে বাধ্য হয়।

এদিকে গত বুধবার যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ এক নতুন হিসাবে জানিয়েছে, এই যুদ্ধে রাশিয়ার মোট সামরিক মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ৫ লাখে পৌঁছেছে।

সম্মুখসমরে রোবটগুলো এখন পদাতিক বাহিনীর সবচেয়ে মৌলিক কাজগুলোও সম্পন্ন করছে। সাইবারের দল একটি জাল দিয়ে ঢাকা ছাউনির নিচে একটি ব্রাউনিং ভারি মেশিন গানকে ট্যাংকের ট্র্যাকের ওপর স্থাপন করছে। এই রোবটটির চারদিকে একাধিক ক্যামেরা রয়েছে, যা লক্ষ্যবস্তুর চারপাশের দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখায়। রোবটটি গাছের আড়ালে দিনের পর দিন শিকারের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারে। এর খাওয়া, দাওয়ার প্রয়োজন নেই বা পায়ে কোনো খিঁচুনি ধরে না। সাইবার জানান, এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো গোলাবারুদ। ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হয়ে গেলে একে পুনরায় ঘাঁটিতে ফিরে আসতে হয়।

সাইবার বলেন, যখন আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে রোবটটি ব্যবহার করলাম, তারা রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল; তারা মাটিতে শুয়ে পড়ছিল, গড়াগড়ি খাচ্ছিল এবং বুঝতে পারছিল না কী করা উচিত।

সাইবারের ইউনিটে এমন পাঁচটি মেশিন রয়েছে এবং তারা ঘণ্টায় ১০ মাইল বেগে চলতে সক্ষম আরেকটি দ্রুতগামী রোবট তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা কালাশনিকভ রাইফেল নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাবে।

যদিও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তবুও সামনের সারির অনেক ইউক্রেনীয় সেনাকে দীর্ঘ সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করতে হচ্ছে।

২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের দুই সেনা—‘ক্রো’ ও ‘ক্রিপি’— টানা যথাক্রমে ৩৪৪ ও ৩৩৪ দিন ফ্রন্টলাইনের ট্রেঞ্চে কাটিয়েছেন। সম্প্রতি তারা দায়িত্ব শেষ করে নিরাপদ এলাকায় ফিরেছেন।

ক্রো জানান, স্ত্রী ও সন্তানদের কথা ভেবেই তিনি মানসিকভাবে টিকে ছিলেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেননি; রেডিওতে বার্তা রেকর্ড করে পাঠাতেন।

অন্যদিকে ক্রিপি বলেন, রুশ ড্রোন হামলা এতটাই ঘনঘন ছিল যে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নির্মাণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক সময় বালুর বস্তা শেষ হয়ে গেলে যা পাওয়া যেত, তাই দিয়ে নিজেদের আড়াল করতে হতো।

প্রায় এক বছর পর কোমল পানীয়ের বোতলে চুমুক দিতে দিতে যখন দুই বন্ধু ফ্রন্টলাইনের নরক থেকে ফিরে আসার কথা ভাবছিলেন, ঠিক তখনই ক্রামাটোরস্ক শহরের আকাশে আরেকটি ড্রোনের শব্দ শোনা গেল, যা শুনে সাধারণ মানুষ দিগ্বিদিক ছুটে পালাচ্ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে এখন চারদিকে শুধু যন্ত্র আর যন্ত্র; যা এই যুদ্ধের সংজ্ঞা চিরতরে বদলে দিচ্ছে।