নিভৃতেই বাংলাদেশের ‘প্রথম বিশ্বকাপ’ অধিনায়ক
ছবি: সংগৃহীত
৪০ বছর পর মেক্সিকো আবারও বিশ্বকাপের স্বাগতিক। ১৯৭০ ও ’৮৬ সালে এককভাবেই বিশ্বকাপ আয়োজন করলেও ২০২৬ সালে কানাডা ও আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে করছে। মেক্সিকো বিশ্বকাপের সঙ্গে বাংলাদেশের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপ দিয়েই বাংলাদেশ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে খেলা শুরু করে।
মেক্সিকো বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক ছিলেন আশীষ ভদ্র। তার সময়ের তো বটেই বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা ফুটবলারদের একজন। ১৯৯০ সালে ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ার শেষ করার পর চট্টগ্রামে নিভৃতেই জীবনযাপন করতেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চট্টগ্রাম আসা-যাওয়া করেই তার সময় কাটছে।
আগামীকাল থেকে শুরু আরেকটি বিশ্বকাপ। সেই উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ বাছাইয়ের অধিনায়কের সঙ্গে যোগাযোগ। এই মুহূর্তে তিনি ভারতের চেন্নাইয়ের নিকটবর্তী শহরে রয়েছেন। সেখান থেকে বলেন,‘ফুটবল ক্যারিয়ারে পায়ের ওপর অনেক চাপ গেছে। একটা বয়স পর্যন্ত সেটা সয়ে গেছে। আমি সম্প্রতি দুই পায়ের হাঁটুতেই অপারেশন করিয়েছি। কয়েক মাস ধরে এখানেই ফিজিও নিচ্ছি।’
১৯৮০-১৯৯০ বাংলাদেশ ফুটবল দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য নাম আশীষ ভদ্র। অসাধারণ সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার ছিলেন। বিশেষ করে তার ডিফেন্স চেরা থ্রু পাস এখনো ফুটবলের আড্ডায় আলোচনার খোরাক জোগায়। ১৯৮৪ সালে মোহামেডান এক বছর এ ছাড়া ক্যারিয়ারে সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন ঢাকা আবাহনীর হয়েই। নিজে যেমন গোল করেছেন আবার সতীর্থদের দিয়েও করিয়েছেন। বাংলাদেশের জার্সি গায়েও রয়েছে একাধিক গোল।
মেক্সিকো বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক ছিলেন আশীষ ভদ্র।
ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে তার অনেক কীর্তি। তবে বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে তার জায়গা অনন্য প্রথম বিশ্বকাপ বাছাইয়ের অধিনায়ক হিসেবে। তাই ৪০ বছর পরও এক তৃপ্তির জায়গা আশীষের,‘ফুটবলে অধিনায়কত্ব আসলে ক্রিকেটের মতো অতটা ম্যাটার করে না। এরপরও অধিনায়ক দলের নেতা যা বড় সম্মানের। বাংলাদেশ ফুটবল দলে অনেকেই অধিনায়কত্ব করেছেন তবে দেশের প্রথম বিশ্বকাপ বাছাইয়ে অধিনায়কত্ব করা আসলেই একটা আলাদা মর্যাদা। এজন্য আমি নিজেকে খানিকটা সৌভাগ্যবানই মনে করি।’
গত এক যুগে বাংলাদেশের ফুটবলে মামুনুল ইসলাম ও জামাল ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে অধিনায়কত্ব করেছেন। আশি-নব্বইয়ের দশকে টুর্নামেন্ট ভেদে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড বদল হতো। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে এশিয়ান অঞ্চলের বাছাই শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। আশীষ এর আগেই অধিনায়ক হওয়ার কথা ছিল। সেটা না হওয়ায় খানিকটা শাপেবরই হয়েছে তার জন্য,‘১৯৮৪ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে প্রথম সাফ গেমস হয়। সেখানে আমার অধিনায়ক হওয়ার কথা ছিল। আমি ঐ সফরে না যাওয়ায় ওয়াসিম ইকবাল অধিনায়ক হয়। ফলে ১৯৮৫ সালে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আমি অধিনায়ক হই।’
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের গ্রুপে ছিল ভারত, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া। ৪০ বছর আগের স্মৃতি হাতড়ে আশীষ বলেন,‘অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক কিছু মনে নেই। ভারতের বিপক্ষে আমরা সেবার জিততে পারিনি, তবে থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে জিতেছিলাম। যা বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল।’
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কার্যক্রম চললেও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের ১৯৭৪ আর ফিফার স্বীকৃতি ১৯৭৬ সালে। ১৯৭৮ ও ১৯৮২ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ কেন অংশগ্রহণ করেনি এর উত্তর জানা নেই আশীষের,‘১৯৭৮ ও ৯২ সালে বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে খেলেছে। ১৯৮০ সালে এশিয়া কাপের মূল পর্বে খেলার পরও কেন ১৯৮২ ইতালি বিশ্বকাপ বাছাইয়ে অংশ নেয়নি বাংলাদেশ এক সময় এ নিয়ে কৌতূহল ছিল এখন এই বয়সে আর এত অতীত নিয়ে ঘাটার মানসিকতা নেই।’
বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য অনেকটাই দিবাস্বপ্ন। ১৯৮০ সালের পর আর এশিয়া কাপেই খেলা হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল টুর্নামেন্ট সাফে ১৪ বছর পর ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠেছে। বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে আশীষের মন্তব্য,‘আশি-নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে অনেক বড় মাপের ফুটবলার ছিলেন। যারা এশিয়ান পর্যায়ের কিন্তু কোচিং, পরিকল্পনা ও নানা বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা আর বিকশিত হয়নি। হামজা চৌধুরী আসার পর বাংলাদেশের ফুটবল আবার আলোচনায় এনেছে। এখন তৃণমূল ও জেলা পর্যায়ে খেলা ছড়িয়ে দিতে হবে।’
বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম কিংবদন্তি কাজী সালাউদ্দিন। ১৬ বছর বাফুফে সভাপতি থাকলেও ফুটবলের প্রকৃত উন্নয়ন করতে পারেননি বলে মনে করেন তার এক সময়ের সতীর্থ আশীষ,‘সালাউদ্দিন ভাই অনেক বড় মাপের খেলোয়াড় কিন্তু সংগঠক হিসেবে তেমন নন। অনেক দিন ফেডারেশনে ছিলেন, অনেক কিছুই করার মতো থাকলেও সেভাবে করতে পারেননি।’
আশীষের সময়কার ফুটবলারদের মধ্যে কেউ ফুটবল ফেডারেশন, কেউ ক্লাব আবার কেউ কোচিংয়ে জড়িত ছিলেন। এত বড় মাপের ফুটবলার হয়েও তিনি তিন দশক একেবারে নিভৃতে জীবনযাপন করছেন। এ নিয়ে তার মন্তব্য,‘খেলোয়াড়ী জীবন শেষ করে চট্টগ্রামেই জীবন বেছে নিয়েছি। ঢাকায় যাতায়াত কমই ছিল আবার ফেডারেশন,ক্লাবের সঙ্গে থাকতে হলে নানা মেরুকরণ বা অনেক ইস্যু থাকে যেগুলো আমি বরাবরই এড়িয়ে চলেছি। তবে এর চেয়েও বোধহয় বড় বিষয় আমি বেশি অর্ন্তমুখী।’
বাংলাদেশ বিশ্বকাপের মূলপর্বে অংশগ্রহণ করে না। এরপরও বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা প্রচুর। আসন্ন বিশ্বকাপ নিয়ে আশীষের মন্তব্য,‘ফ্রান্স-ব্রাজিল আমার পছন্দের তালিকায়। তবে এই বিশ্বকাপ একটু অন্য রকম কারণ টিকিটের অত্যন্ত উচ্চ মূল্য ও আরো অনেক ইস্যুতে। ’ বাংলাদেশে ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফি প্রায়ই প্রদক্ষিণ করে। ট্রফি প্রদর্শনীতে সমাজের নানা স্তরের মানুষ গেলেও আশীষ ভদ্রকে কখনো দেখা যায়নি। অথচ তিনিই বাংলাদেশের ‘প্রথম’ বিশ্বকাপের অধিনায়ক। এ নিয়ে খানিকটা আফসোস রয়েছে তার,‘একজন ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের ট্রফি দেখা ও ছবি তোলার ইচ্ছা নেই, এটা বললে একেবারেই ভুল বলা হবে না। আসলে এটা খুব দ্রুত সময়ের জন্য আসে অনেক সময় জানাও যায় না। আবার ফেডারেশন চাইলে সাবেক অধিনায়কদের জানাতে পারে সেটাও করে না।’