নিয়মিত তওবা-ইস্তেগফার যেভাবে বদলে দেয় জীবনের গতিপথ

নিয়মিত তওবা-ইস্তেগফার যেভাবে বদলে দেয় জীবনের গতিপথ

ছবি: সংগৃহীত

মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। জীবনের পথে চলতে গিয়ে ছোট-বড় গুনাহ, অবহেলা ও নানা ধরনের বিচ্যুতি ঘটতেই পারে। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য হলো, এটি মানুষকে হতাশার অন্ধকারে ফেলে রাখে না; ফিরে আসার দরজা সবসময় খোলা রাখে। সেই ফিরে আসার অন্যতম মাধ্যম হলো তাওবা ও ইস্তেগফার।

তাওবা মানে গুনাহ থেকে আন্তরিকভাবে ফিরে আসা, আর ইস্তেগফার মানে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এটি শুধু গুনাহ মাফের আমল নয়; একইসঙ্গে রিজিকে বরকত, দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি, অন্তরের প্রশান্তি এবং আখেরাতের সফলতা অর্জনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এ কারণেই আলেমগণ ইস্তেগফারকে মুমিনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

গুনাহ মাফ ও অন্তরের পরিশুদ্ধি

গুনাহ মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে দেয় এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করে। কিন্তু আন্তরিক তাওবা ও ইস্তেগফার সেই দূরত্ব দূর করে দেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর কেউ মন্দ কাজ করলে অথবা নিজের ওপর জুলুম করলে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে সে আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু পাবে।’ (সুরা নিসা: ১১০)
হাদিসে এসেছে, বান্দা যখন গুনাহ করে তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। এরপর সে তাওবা ও ইস্তেগফার করলে সেই দাগ মুছে যায় এবং অন্তর আবার পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। (জামে তিরমিজি: ৩৩৩৪)

রিজিকে বরকত ও জীবনে প্রাচুর্য

অনেক মানুষ অভাব, সংকীর্ণতা ও জীবনের নানা অপ্রাপ্তি নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইস্তেগফারকে রিজিক বৃদ্ধি ও দুনিয়াবি কল্যাণ লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হজরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিবর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নহরসমূহের ব্যবস্থা করবেন।’ (সুরা নূহ: ১০-১২)
মুফাসসিরগণ বলেন, এসব আয়াত থেকে বোঝা যায় যে ইস্তেগফার আল্লাহর রহমত, বরকত ও প্রাচুর্য লাভের অন্যতম কারণ।

দুশ্চিন্তা ও সংকট থেকে মুক্তির পথ

জীবনে এমন সময় আসে, যখন চারদিক অন্ধকার মনে হয়। নানা সমস্যা, ঋণ, পারিবারিক অশান্তি কিংবা মানসিক চাপ মানুষকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এ অবস্থায় ইস্তেগফার হতে পারে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা দূর করে দেবেন, প্রতিটি সংকট থেকে বের হওয়ার পথ করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করেনি।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৮)

আজাব ও বিপদ থেকে সুরক্ষা

পাপাচার যখন ব্যক্তি ও সমাজে ব্যাপক হয়ে যায়, তখন আল্লাহর গজব ও শাস্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। ইস্তেগফার সেই শাস্তি থেকে রক্ষার অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ এমন নন যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে অথচ তিনি তাদের শাস্তি দেবেন।’ (সুরা আনফাল: ৩৩)
তাই ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ইস্তেগফার এক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তার ঢাল।

আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের উপায়

প্রত্যেক মুমিনের সবচেয়ে বড় কামনা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা: ২২২)
গুনাহের পর অনুতপ্ত হয়ে যে বান্দা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন। তাই তওবা শুধু ক্ষমা লাভের নয়, বরং আল্লাহর মহব্বত অর্জনেরও পথ।

নবীজি (স.)-এর নিয়মিত আমল

রাসুলুল্লাহ (স.) ছিলেন নিষ্পাপ। তারপরও তিনি নিয়মিত ইস্তেগফার করতেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি দিনে সত্তরেরও বেশি বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাওবা করি।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩০৭)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি দিনে একশ বার পর্যন্ত ইস্তেগফার করতেন। (সহিহ মুসলিম: ২৭০২) এ থেকে বোঝা যায়, ইস্তেগফার আল্লাহর নৈকট্য ও আত্মিক উন্নতির জন্যও অপরিহার্য।

জান্নাত লাভের সুসংবাদ

রাসুলুল্লাহ (স.) ‘সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার’-এর বিশেষ ফজিলত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সকালে এই দোয়া পাঠ করবে এবং সন্ধ্যার আগে মারা যাবে, সে জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি রাতে পাঠ করবে এবং সকাল হওয়ার আগে মারা যাবে, সেও জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩০৬)

তাওবা কবুল হওয়ার শর্ত

ফুকাহায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন, তাওবা কবুল হওয়ার জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি-
১. গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া।
২. গুনাহের কাজ বর্জন করা।
৩. ভবিষ্যতে সেই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।
৪. মানুষের হক নষ্ট হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।

তাওবা ও ইস্তেগফার আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক মহান ইবাদত। এর মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয়, অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, দুশ্চিন্তা দূর হয়, রিজিকে বরকত আসে এবং আখেরাতের সফলতার পথ সুগম হয়। আজকের ব্যস্ত ও অস্থির জীবনে মানুষ শান্তি ও কল্যাণের সন্ধান করে। অথচ সেই শান্তির অন্যতম চাবিকাঠি হতে পারে প্রতিদিনের কিছু সময়ের আন্তরিক ইস্তেগফার। এই একটি আমলই আল্লাহর রহমতে বদলে দিতে পারে একজন মানুষের জীবনের গতিপথ।

ইস্তেগফারের সহজ একটি দোয়া

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি।
অর্থ: ‘আমি সেই মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক; এবং আমি তাঁর কাছেই তওবা করছি।’

তথ্যসূত্র: সুরা নিসা: ১১০; সুরা বাকারা: ২২২; সুরা আনফাল: ৩৩; সুরা নূহ: ১০-১২; বুখারি: ৬৩০৬, ৬৩০৭; মুসলিম: ২৭০২; আবু দাউদ: ১৫১৮; তিরমিজি: ৩৩৩৪