শিশুরা কি আসলেই অনিরাপদ?

শিশুরা কি আসলেই অনিরাপদ?

ফাইল ছবি

দৈনিক সমকাল-এ ৯ জুন ২০২৬ জনাব গত্তহার নঈম ওয়ারার মতামত প্রকাশিত হয়েছে “শিশুদের অভয়াশ্রমে যখন শিশুরাই অনিরাপদ” শিরোনামে। গত ২৭ মে ভোরে রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দুর্ঘটনাবশত ছয় নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে এটি। ৭০০ শয্যার যে হাসপাতালটি ইতিমধ্যেই গরীবের হাসপাতাল হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে, যে হাসপাতালে ৯০ টি শয্যা শিশুদের জন্য, ২০ টি শয্যা অপুষ্টিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিশুর অভিভাবকদের খাওয়াসহ সেবা প্রদান করে, যে হাসপাতালে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ১০১ শয্যার নবজাতক নিবিড় পরিচর্য্যা কেন্দ্র রয়েছে, তাকে জনাব ওয়ারা অনিরাপদ বলেছেন। এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০ টা শিশু প্রসব হয় আর নবজাতক নিবিড় পরিচর্য্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা দেয় কমপক্ষে ৯০ টি নবজাতকের। তাহলে হাসপাতালটি প্রতিদিন প্রায় ১৪০ টি নবজাতকের সেবা দিয়ে থাকে এবং সেটি মাসের ৩০ দিনে, বছরের ৩৬৫ দিনে। এই বিপুল সংখ্যক নবজাতকের চিকিৎসার ভরসা স্থলে এতদিন কোন অঘটনের কথা কেউ শোনেনি। কিন্তু ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে সব অর্জন স্লান হয়ে গেল। যে কোন মৃত্যুই দুঃখজনক, সে কথা স্মরণে রেখেই বলা যায় যারা বছরে ৫০,০০০ অধিক নবজাতককে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তাদের ওখানে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু কি খুব বড় ঘটনা? মনে রাখতে হবে, হাসপাতাল চিকিৎসা কেন্দ্র, মৃত্যু ঠেকানোর নিশ্চয়তাকারী নয়।

আংশিক সত্যের সাথে আংশিক কল্পনা যোগ করে জনাব ওয়ারা আদ্-দ্বীন হাসপাতাল, সেভ দ্য চিলড্রেন ও টাউনস্ উইমেন্স গিল্ডস নিয়ে যে কাহিনী বয়ান করেছেন, সেটিকে সার্বিকভাবে চিত্রায়িত করা দরকার। ১৯৭২-৭৩ এ দুর্ভিক্ষের সময় সেভ দ্য চিলড্রেন ইউকে চিলড্রেনস নিউন্ট্রিশন ইউনিট চালু করে অপুষ্টিজনিত শিশুর চিকিৎসার জন্য। ভাড়া বাড়ীতে অবস্থিত এই চিকিৎসা কেন্দ্র কয়েকবার স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়, যা চিকিৎসাকে ব্যহত করে। এরশাদ সরকারের প্রথমদিকে রানী এলিজাবেথের বাংলাদেশ সফরের সময় এই চিলড্রেন্স নিউট্রিশন ইউনিট পরিদর্শন কালে সেখানকার কর্মীরা ভাড়া বাড়ীতে চিকিৎসা প্রদানের অসুবিধার কথা উল্লেখ করে কেন্দ্রের জন্য স্থায়ী স্থাপনার অনুরোধ করে। রানী এরশাদকে জানান যে সরকার জমি দিলে তিনি ভবন নির্মানের ব্যবস্থা করে দেবেন। পরবর্তীতে মগবাজারে একটি জমি সরকার নাম মাত্র মূল্যে সেভ দ্য চিলড্রেনকে প্রদান করে। রানী তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহের জন্য প্রিন্সেস এ্যানকে অনুরোধ করেন। প্রিন্সেস এ্যান তখন টাউন উইমেন্স গিল্ডসকে অনুরোধ করলে তারা “ঢাকা আপীল”-এর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে চিলড্রেন্স নিউট্রিশন ইউনিট নির্মান করে দেয়। ১৯৯৫ সালে এসে সেভ দ্যা চিলড্রেন উপলদ্ধি করে ৬০ শয্যার হাসপাতালের মাধ্যমে অপুষ্টিজনিত শিশুদের সেবা প্রদান করে বাংলাদেশে অপুষ্টি সমস্যার সমাধানে কোন ফলপ্রসু অবদান রাখা সম্ভব না। উপরক্ত চিলড্রেনস নিউট্রিশন ইউনিট সেভ দ্য চিলড্রেনের বার্ষিক বাজেটের ৮০% খরচ করার ফলে অনান্য কাজ করার সীমাবদ্ধতা তৈরী হয়। এমতাবস্থায় সেভ দ্য চিলড্রেন চিলড্রেনস নিউট্রিশন ইউনিট পরিচালনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু টাউন উইমেন্স গিল্ডের শর্ত ছিল তাদের অর্থায়নে নির্মিত ভবনে অনাদিকালের জন্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টি ছাড়া অন্য কাজে ব্যয় করা যাবে না। সহযোগী খোঁজার পরিক্রমায় সেভ দ্য চিলড্রেন আদ্-দ্বীনকে চিহিৃত করে কতিপয় শর্ত দিয়ে প্রথমে অস্থায়ীভাবে এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে চিলড্রেন্স নিউট্রিশন ইউনিটের জমিসহ স্থাপনা আদ্-দ্বীন প্রদান করে। উল্লেখ্য যে, আজকের আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে যে সমস্ত স্থাপনা রয়েছে তার অধিকাংশই আদ্-দ্বীন পরবর্তীতে আশে পাশে স্থাপনা ও জমি ক্রয় করে সস্ম্রসারিত করেছে।

তাই চিলড্রেন্স নিউট্রিশন ইউনিট স্থাপনে ১৯৭৪ সালে থেকে টাউন উইমেন্স গিন্ডেসের সম্পৃক্ততার, আদ্-দ্বীনকে জমি ও স্থাপনা প্রদানে তাদের সংপৃক্ততার এবং টাউন উইমেন্স গিল্ডেসর জমিসহ বাড়ী কেনার কল্পকাহিনীর সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই। শেরে বাংলা নগরে শিশু হাসপাতালের প্রতিষ্ঠিার যে কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে তাও সত্যের ব্যতয়। প্রকৃত সত্য হলো, দেশ স্বাধীন হবার পর তখনকার শিশু চিকিৎসক ডা. তোফায়েল আহমেদ ধানমন্ডিতে পাকিস্তানের স্পীকার ও অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাড়ীতে শিশু হাসপাতাল চালু করেন। জনাব চৌধুরী তখন কারাগারে ও তার সন্তানেরা বিদেশে। ১৯৭৫-এর পর তার বড় ছেলে জনাব সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী দেশে ফিরে বাড়ীর দখল নিলে, শিশু হাসপাতালটি অস্থায়ীভাবে তখনকার পঙ্গুঁ হাসপাতালের একাংশ ঠাই নেয়। এখনও শিশু হাসপাতালের ভবন ও নিটোরের ভবনের অবস্থান খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে দুটি একই ভবনের। সুতরাং শিশু হাসপাতালের প্রতিষ্ঠার সাথে সিএনইউর সম্পৃক্তত্তা বা সিএনইউর সাথে ডা: তোফায়েল আহমদের সম্পৃক্তত্তা কোনটাই সঠিক নয়। জনাব ওয়ারা জানাচ্ছেন যে, ১৯৭৭ সালে শেরে বাংলা নগরে পুর্নাঙ্গ শিশু হাসপাতাল চালু হলে পুরো বন্ধ হয়ে যায় মগবাজারের সিএনইউ। ঠিক হয় মগবাজারের বাড়িটি এমন একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে যারা শিশু ও মায়েদের জন্য একটি শিশু সংবেদনশীল পুর্নাঙ্গ হাসপাতাল গড়ে তুলবে। সে শর্ত নিয়েই সিএনইউর সেই বাড়িটি দেওয়া হয়েছিল আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে ১৯৯৫ পর্যন্ত সিএনইউ সেভ দ্য চিলেড্রেন পরিচালনা করেছে ও ঐ বছরের শেষের দিকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সহযোগী সংগঠন নির্বাচিত করে আদ্-দ্বীনকে হস্তান্তরিত করেছে ১৯৯৭ সালে।

এত সমস্থ তথ্য বিভ্রান্তের সাথে জনাব ওয়ারার ঢালাও মন্তব্য আদ্-দ্বীনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো সেবা বিক্রি ও মুনাফামনস্ক মালিক নিয়ে আরেক প্রস্ত আলোচনা দরকার। তবে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধের ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমজনতার যে মন্তব্য ঝড় উঠেছে তা জনাব ওয়ারার মন্তব্যের বিপরীত। জনাব ওয়ারা আরও লিখেছেন হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর নিরাপত্তারক্ষীদের দিয়ে সংবাদ মাধ্যম কর্মীদের ধাওয়া দেবার কথা। সংবাদমাধ্যম কর্মীদের অসংলগ্ন মন্তব্য যে কতটা ভয়াবহ ফল আনতে পারে তা পতিত প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আমরা দেখেছি। এখানেও জনৈক সংবাদ মাধ্যম কর্মীর পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে ঝাড়–দার বলে সম্বোধন করা বিস্ফোরন ঘটিয়েছে। জনাব ওয়ারার মতো ভদ্দরলোকেরা কি পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অসম্মান করাটাকে জায়েজ করছেন, তারা দরিদ্র বলে? কিন্তু ওরা দরিদ্র হলেও, আত্মসম্মান রক্ষার ক্ষেত্রে শোন মহাজন, আমরা নই একজন-এ বিশ্বাসী।

 

লেখক: ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর

সেভ দ্য চিলড্রেনের ১৯৮৫-২০০০ সালে স্বাস্থ্য কর্মসূচীর প্রধান