পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট প্রকাশ
ছবিঃ সংগৃহীত।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সোমবার (২২ জুন) দুপুর ১২টা থেকে একটানা ৯০ মিনিট বাজেট পেশ করেন তিনি। ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের (অবশিষ্ট ৮মাস) জন্য পেশ করা হলো এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। বিকশিত বাংলাই হবে এই বাজেটের লক্ষ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেটে কর্মসংস্থান, শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য একাধিক ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে রাজ্যে একাধিক নতুন জেলা তৈরির প্রস্তাব পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমানে ২৩টি জেলা রয়েছে। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য এরমধ্যে বেশ কিছু বড় জেলা ভেঙে নতুন আরও পাঁচটি জেলা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এছাড়া বেশ কয়েকটি মহকুমা ও পৌরসভা তৈরিও প্রস্তাব এদিন রাজ্য বাজেটে পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
নতুন পাঁচ জেলা হলো- কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর ও আরামবাগ। নতুন একটি মহকুমা হবে গোপীবল্লভপুর। এছাড়া নতুন সাতটি পৌরসভা হবে। সেগুলো হলো- শিবমন্দির, গাজল, চাঁচল, বেলদা, বাদনানা, কামারপুকুর ও কোলাঘাট।
বাজেটে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের উপরে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাজ্যের শিল্প স্থাপনের জন্য শিল্পপতিদের আকর্ষণ করতে পাঁচ হাজার কোটি রুপির ইনসেনটিভ স্কিম, ওয়ান উইন্ডো পারমিশন এবং প্রয়োজনে ল্যান্ড সিলিং বিবেচনা করার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া কলকাতায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ চালু করার উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শিল্পপতিদের আকর্ষণ করার জন্য রাজ্যের পরিবহন অবকাঠামোর উপরেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কলকাতা বিমানবন্দরের উপর চাপ কমাতে কলকাতার কাছে কল্যাণীতে নতুন বিমানবন্দর তৈরির প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে এই বাজেটে। কল্যাণীর কাছে একটি ‘গ্রিনফিল্ড’ বিমানবন্দর তৈরি করতে ১ হাজার-১ হাজার ৫০০ একর জমি শনাক্ত করবে সরকার। পাশাপাশি কেন্দ্রের উড়ান প্রকল্পের আওতায় পুরুলিয়া, বালুরঘাট এবং মালদহেও বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
এতদিন শুধু কলকাতা ও আশপাশের এলাকার মানুষই মেট্রোরেলের সুবিধা পেয়ে এসেছেন। যদিও এবার রাজ্যের অন্যান্য জেলার মানুষও মেট্রো পেতে চলেছেন। দুর্গাপুর, আসানসোল ও শিলিগুড়িতে মেট্রো চালু করা হবে। সেই মতো একটি সার্ভে শুরু করার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী।
কলকাতার পাশে মেদিনীপুরে নতুন গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করা হবে। সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিক ব্রিজ তৈরির ঘোষণা ও রেল যোগাযোগের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বাজেটে।
বিজেপি বলছে, এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে রাজ্যের বেকারত্ব দূরীকরণকে। সরকারি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের জট খুলতে বাজেটে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পড়ে থাকা প্রায় এক লাখ শূন্যপদে নতুন কর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এই এক লাখ শূন্যপদের মধ্যে ২০ হাজার পুলিশ, ৫০ হাজার শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্মী এবং এক হাজার ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল নিয়োগ করা হবে। শূন্যপদের ১০ শতাংশ অগ্নিবীরদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। সরকারি পদে নিয়োগে ক্ষেত্রে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ইতোমধ্যে পাঁচ বছর ছাড় দেয়া হবে। এই সুবিধা পরবর্তী দুই বছরের জন্য বহাল থাকবে।
বাজেটে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর শুনিয়েছে বিজেপি সরকার। রাজ্য সরকারি কর্মী, পেনশনভোগীদের আরও ২০ শতাংশ ডিএ ঘোষণা করেছে, রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হলো ৩৮ শতাংশ। আগামী ১ অক্টোবর থেকে সরকারি কর্মীদের নতুন হারে ডিএ কার্যকর হবে ।
অর্থমন্ত্রী স্বপন বলেন, প্রাথমিকের মিড মে মিলে উপকরণ পিছু খরচ ১০ রুপি করা হবে। ইসকনের সহযোগিতায় কলকাতা পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন স্কুলে পুষ্টিকর রান্নার জন্য মিড ডে মিল দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কাঁথি, কালিয়াচক, তুফানগঞ্জ, ফলতায় নারী কলেজ গড়ে তোলা হবে। ঝাড়গ্রামে গড়ে তোলা হবে আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয়। যার জন্য বরাদ্দ করা হবে ১০০ কোটি রুপি। এছাড়া, ১০০ জন মেধাবী পড়ুয়াদের জন্য স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট কাম মিন্স স্কলারশিপ বরাদ্দ করা হবে। কলকাতায় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। উত্তরবঙ্গে গড়ে তোলা হবে একটি আইআইটি, আইআইএম এবং একটি এমস। ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায় দু’টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবে। তৈরি করা হবে ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্ত্রী জানান, যারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সেই সব সরকার ও সরকার পোষিত কলেজের পড়ুয়াদের এককালীন ৩০ হাজার রুপি আর্থিক সাহায্য দেয়া হবে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য রাজ্যে বিনামূল্যের কোচিং সেন্টার চালু করা হবে। রাজ্যের প্রতিটি জেলায় এরকম বিনামূল্যের কোচিং সেন্টার থাকবে। রাজ্যে আদর্শ বিদ্যালয় গড়ে তোলার জন্য ২ হাজার ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হবে। পাশাপাশি, সংস্কৃত কলেজ ও সংস্কৃত ভাষার প্রসারের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫০ কোটি রুপি। স্কুল ড্রপ আউট রুখতে উচ্চশিক্ষায় নারীদের দেয়া হবে ৫০ হাজার রুপি। মিড ডে মিলের জন্য ৪৭ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে।
অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, এখন থেকে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থানের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মদের দোকানের লাইসেন্স দেয়া হবে না। কলকাতা পৌরসভার ক্ষেত্রে এই লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম দূরত্ব হবে ৫০০ মিটার।
স্টেট ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক কন্ডাক্টরদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করে মাসে ১৬ হাজার রুপি করা হবে। সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ ও গ্রিন পুলিশদের পারিশ্রমিকও ২ হাজার রুপি করে বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। হোমগার্ডদেরও পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পাচ্ছে ২ হাজার রুপি। বয়স্ক, বিধবা এবং বিশেষভাবে সক্ষমদের মাসিক ভাতা ৫০০ রুপি করে বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয়েছে বাজেটে।
নারীদের বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫৫০ কোটি রুপি। এই উদ্দেশ্যে শিগগিরই ‘পিঙ্ক কার্ড’ চালু করা হবে বলে ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। নারীদের মাসিক সহায়তা প্রকল্প অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ৩৬ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে বাজেটে।
এছাড়া রাজ্যের ২৯৪ জন বিধায়কের জন্য বিধায়ক তহবিল ৭০ লাখ রুপি থেকে বৃদ্ধি করে ১ কোটি রুপি করা হচ্ছে। ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী যোগ্য-শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাসিক ভাতা দেয়ার জন্য অক্টোবর থেকে ভরসা কর্মসূচি চালু হবে। এই প্রকল্পে স্নাতক বেকারদের জন্য মাসে ৩ হাজার রুপি এবং অন্যদের মাসে ২ হাজার রুপি ভাতা দেয়া হবে।
এদিন অর্থমন্ত্রী আরও জানান, রাজ্যের মোট ঋণ রয়েছে ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৯১ কোটি রুপি।