দোয়ার আগে ও পরে রাসুল (স.)-এর শেখানো আমল

দোয়ার আগে ও পরে রাসুল (স.)-এর শেখানো আমল

ছবি: সংগৃহীত

দোয়া একটি মূল্যবান ইবাদত। এটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। এতে রয়েছে নির্দিষ্ট আদব ও সুন্নতসম্মত কিছু নিয়ম, যা দোয়ার গ্রহণযোগ্যতা ও বরকত বৃদ্ধিতে সহায়ক। রাসুলুল্লাহ (স.) দোয়ার আগে ও পরে এমন কিছু আমল শিক্ষা দিয়েছেন, যা কোরআন ও সহিহ হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। নিচে তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো।

দোয়ার আগে করণীয় আমল

১. আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ দিয়ে শুরু করা

দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করা এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদব। রাসুল (স.) বলেন- ‘তোমাদের কেউ যখন দোয়া করে, সে যেন প্রথমে তার রবের প্রশংসা ও গুণগান করে, তারপর নবীর ওপর দরুদ পাঠ করে, এরপর যা ইচ্ছা দোয়া করে।’ (আবু দাউদ: ১৪৮১; তিরমিজি: ৩৪৭৭)

২. আল্লাহর সুন্দর নাম (আসমাউল হুসনা) দিয়ে দোয়া করা

আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকো।’ (সুরা আরাফ: ১৮০)

দোয়ার সময় আল্লাহর গুণবাচক নাম (যেমন ইয়া রাহমান, ইয়া গাফফার, ইয়া রাজ্জাক) দিয়ে আহ্বান করা দোয়ার আদব ও বিনয়কে আরও গভীর করে।

৩. অজু ও পবিত্রতা অবলম্বন করা

অজু করে পবিত্র অবস্থায় থাকা দোয়ার আদব। যদিও দোয়ার জন্য অজু শর্ত নয়, তবে রাসুলুল্লাহ (স.) বিশেষ কিছু দোয়ার ক্ষেত্রে পবিত্র অবস্থায় দোয়া করেছেন- যেমন হুনায়নের পরবর্তী ঘটনায় (বুখারি)। এটি দোয়ার জন্য একটি পরিশুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করে।

৪. ইস্তেগফার ও তওবা করা

দোয়ার আগে নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা দোয়ার আত্মিক প্রস্তুতিকে শক্তিশালী করে এবং বিনয় বৃদ্ধি করে।

৫. কেবলামুখী হয়ে হাত উঠানো

দোয়ার সময় কেবলার দিকে মুখ করা এবং বিনয়ের সঙ্গে দুই হাত উঠানো সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘তোমাদের রব অত্যন্ত লজ্জাশীল ও দানশীল। বান্দা যখন দুই হাত তুলে দোয়া করে, তখন তিনি তা খালি ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।’ (আবু দাউদ: ১৪৮৮; তিরমিজি: ৩৫৫৬)

৬. বিনয়, ভয় ও আশা নিয়ে দোয়া করা

দোয়ার সময় হৃদয়ে বিনয়, আল্লাহভীতি এবং রহমতের আশা একসঙ্গে থাকা গুরুত্বপূর্ণ আদব। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনয়ের সাথে ও নিভৃতে।’  ‍(সুরা আরাফ: ৫৫)

দোয়ার পরে করণীয় আমল

১. দরুদ ও হামদ দিয়ে দোয়া শেষ করা

যেভাবে দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ পাঠ করা হয়, ঠিক তেমনি দোয়ার শেষে আবারও হামদ ও দরুদ পাঠ করে দোয়া সমাপ্ত করা উত্তম।

২. দুই হাত মুখে মোছা

দোয়া শেষ করার পর দুই হাত দিয়ে মুখমণ্ডল মোছা সম্পর্কে হাদিস পাওয়া যায়। হজরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত- রাসুল (স.) দোয়ার সময় হাত উঠাতেন এবং দোয়া শেষে তা দিয়ে মুখ মুছতেন। (তিরমিজি: ৩৩৮৬)

(অনেক আলেম এটিকে হাসান পর্যায়ের হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।)

৩. ‘আমিন’ বলা

দোয়ার শেষে ‘আমিন’ বলা সুন্নত। এর অর্থ ‘হে আল্লাহ, কবুল করুন।’

৪. কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রাখা

দোয়া করার পর আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখা জরুরি। সন্দেহ বা হতাশা দোয়ার আদবের পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কবুলের দৃঢ় প্রত্যয় রেখে তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করবে।’ (তিরমিজি: ৩৪৭৯)

৫. তাড়াহুড়ো না করা

দোয়া করে তাৎক্ষণিক ফল না পেলে হতাশ হওয়া উচিত নয়। বরং ধৈর্য রাখা এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

৬. দোয়ার ফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া

হাদিসে এসেছে, দোয়ার ফল তিনভাবে প্রকাশ পায়-
১) চাওয়া জিনিস দেওয়া হয়,
২) কোনো বিপদ দূর করা হয়,
৩) অথবা তা আখেরাতের জন্য সঞ্চয় করে রাখা হয়।

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেখানো এই আদবগুলো অনুসরণ করলে দোয়া হয় আরও বিনয়পূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও বরকতময়। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত দোয়ার আগে ও পরে এসব সুন্নতসম্মত আমল গুরুত্বসহকারে পালন করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আদবসহ দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।