কালো জাদুর ভয়ংকর ইতিহাস: কোরআন আমাদের কী শিক্ষা দেয়
ছবি: সংগৃহীত
জাদুবিদ্যা বা কালো জাদু মানব ইতিহাসের বহু পুরোনো বাস্তবতা। প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে জাদুবিদ্যার চর্চা, অলৌকিক ক্ষমতার দাবি এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার নানা কৌশলের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। ইসলাম এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে। একদিকে কোরআন জাদুবিদ্যার অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছে, অন্যদিকে এর অনুসরণ ও চর্চা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে।
কোরআনে বিশেষভাবে এমন এক জাতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের একাংশ জাদুবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করার পথে পা বাড়িয়েছিল। এ ঘটনাটি মুসলমানদের জন্য আজও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
বনি ইসরাইল ও জাদুবিদ্যার ঘটনা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা সেই বিষয়ের অনুসরণ করল, যা সুলাইমানের রাজত্বকালে শয়তানরা পাঠ করত। সুলাইমান কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা শিক্ষা দিত...।’ (সুরা বাকারা: ১০২)
এই আয়াতে বনি ইসরাইলের একাংশের এমন একটি প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা আল্লাহর নাজিলকৃত হেদায়াতের পরিবর্তে শয়তানদের প্রচারিত ভ্রান্ত ধারণা ও জাদুবিদ্যার অনুসরণ করতে শুরু করে। আয়াতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাবেলে প্রেরিত হারুত ও মারুত নামের দুই ফেরেশতার মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করা হয়েছিল। তারা কাউকে কিছু শেখানোর আগে স্পষ্টভাবে সতর্ক করতেন- ‘আমরা তো কেবল পরীক্ষা; অতএব তুমি কুফরি করো না।’ (সুরা বাকারা: ১০২) তবুও কিছু লোক সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে শয়তানি পথে পা বাড়াত।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর অপচেষ্টা
কোরআনে জাদুবিদ্যার অন্যতম ক্ষতিকর ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা এমন বিষয় শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা যায়।’ (সুরা বাকারা: ১০২)
তবে একই আয়াতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে- ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর দ্বারা কারও কোনো ক্ষতি করতে পারত না।’
এ আয়াত মুসলমানদের একটি মৌলিক আকিদা শিক্ষা দেয় যে, জাদুবিদ্যা বা অন্যকোনো সৃষ্টি স্বাধীনভাবে উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না। সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতির অধীন।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর জাদুর প্রভাব ও প্রতিকার
জাদুর বাস্তবতার অন্যতম প্রমাণ হলো রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর জাদুর প্রভাবের ঘটনা। লাবিদ ইবনুল আসাম নামক এক ইহুদি ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর জাদু করেছিল, যার ফলে তিনি কিছু সময় শারীরিকভাবে প্রভাবিত হন। এ ঘটনা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
অনেক তাফসিরবিদের মতে, এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে সুরা ফালাক ও সুরা নাস নাজিল হয়। এই দুই সুরা পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে জাদুর প্রভাব থেকে মুক্তি দান করেন।
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, কোরআনের আয়াত, দোয়া এবং বৈধ রুকইয়াহ জাদুর অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
সুলাইমান (আ.)-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার
কিছু লোক হজরত সুলাইমান (আ.)-এর নবুয়ত ও রাজত্বকে জাদুবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। কোরআন এ অপবাদকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন- ‘সুলাইমান কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল।’ (সুরা বাকারা: ১০২)
এ থেকে বোঝা যায়, নবীদের মুজিজার সঙ্গে জাদুর কোনো সম্পর্ক নেই। মুজিজা আল্লাহপ্রদত্ত সত্যের নিদর্শন, আর জাদু হলো মানুষকে বিভ্রান্ত করার একটি নিষিদ্ধ উপায়।
ফেরাউনের জাদুকরদের ঘটনা
কোরআনে জাদুবিদ্যার আরেকটি আলোচিত ঘটনা হলো ফেরাউনের জাদুকরদের কাহিনি। তারা মানুষের চোখে বিভ্রম সৃষ্টি করত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা মানুষের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিল এবং তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করল; আর তারা এক বড় ধরনের জাদু প্রদর্শন করল।’ (সুরা আরাফ: ১১৬)
কিন্তু আল্লাহর মুজিজার সামনে তাদের জাদু পরাজিত হয়। হজরত মুসা (আ.)-এর লাঠির মুজিজা প্রত্যক্ষ করার পর তারা সত্য গ্রহণ করে ঈমান আনেন। (সুরা ত্ব-হা: ৭০)
এ ঘটনা দেখায় যে, সত্যের শক্তির সামনে জাদুর ভেলকি শেষ পর্যন্ত টিকতে পারে না।
জাদুকর ও গণকদের ব্যাপারে হাদিসের সতর্কতা
রাসুলুল্লাহ (স.) জাদুবিদ্যা, গণক ও ভাগ্যবক্তাদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি গণকের কাছে গেল এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর যা নাজিল হয়েছে, সে তা থেকে দায়মুক্ত (অর্থাৎ ইসলামের গন্ডির বাইরে)’ (মুসনাদ আহমদ: ৯৫৩২; সুনানে আবু দাউদ: ৩৯০৪)
আরেক হাদিসে জাদুবিদ্যাকে ধ্বংসাত্মক সাতটি মহাপাপের একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (সহিহ বুখারি: ২৭৬৬)
আধুনিক যুগে কালো জাদুর নামে প্রতারণা
বর্তমান সময়েও কালো জাদু, তাবিজ, প্রেম ফেরানো, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ঠিক করা, ব্যবসায় উন্নতি ঘটানো কিংবা শত্রুকে ক্ষতিগ্রস্ত করার নামে নানা ধরনের প্রতারণা দেখা যায়। অনেক ভণ্ড কবিরাজ ও প্রতারক এসব দাবির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করে।
ইসলামে এমন দাবির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস এবং জাদুকর, গণক বা ভাগ্যবক্তাদের শরণাপন্ন হওয়া থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। কোনো সমস্যার সমাধান খোঁজার ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহসম্মত পন্থাই একজন মুসলমানের জন্য নিরাপদ পথ।
কালো জাদুর ভয় নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা
ইসলাম জাদুবিদ্যার অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। তবে একই সঙ্গে মুসলমানদের অযথা ভয়, গুজব ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকতে শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি উষার প্রতিপালকের কাছে... গিরায় ফুঁ দেওয়া জাদুকারিণীদের অনিষ্ট থেকে।’ (সুরা ফালাক: ১-৪)
শরিয়তে নিষিদ্ধ জাদুবিদ্যার চর্চা সাধারণত শয়তানি কার্যকলাপ ও কুফরি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে আলেমরা উল্লেখ করেছেন।
মুসলমানের করণীয় হলো আল্লাহর ওপর ভরসা করা, নিয়মিত নামাজ আদায় করা, সকাল-সন্ধ্যার জিকির করা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করা। কোনো সমস্যা হলে ভণ্ড কবিরাজের কাছে না গিয়ে অভিজ্ঞ আলেম (মুয়াল্লিজ)-এর মাধ্যমে রুকইয়াহ বা বৈধ ঝাড়ফুঁকের সাহায্য নেওয়া উচিত।
শেষ কথা, জাদুবিদ্যা মানুষকে বিভ্রান্তি, কুসংস্কার এবং অনেক ক্ষেত্রে কুফরি ও শিরকের দিকে নিয়ে যায়। কোরআনে বর্ণিত ঘটনাগুলো আমাদের সতর্ক করে যে, সাময়িক কোনো ক্ষমতা বা লাভের লোভে পড়ে ঈমান ও আকিদাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা যাবে না।
জাদুর অন্ধকার পথ থেকে বাঁচতে আল্লাহর কালাম, দোয়া, জিকির এবং তাঁর ওপর দৃঢ় তাওয়াক্কুলই একজন মুমিনের সর্বোত্তম আশ্রয়। কোরআনের শিক্ষা হলো- ভয় নয়, আল্লাহর ওপর ভরসাই একজন মুমিনের প্রকৃত শক্তি।