ইউক্রেনের হামলায় কঠিন জ্বালানি সংকটে রাশিয়া
ফাইল ছবি।
রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর সড়কে চোখে পড়ছে গাড়ি ও ট্রাকের দীর্ঘ লাইন। দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে পাম্পগুলোর সামনে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। অনেকে আবার জ্বালানির খোঁজে সারাদিন গাড়ি নিয়ে ঘুরেছেন। বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশের রাজধানীতে এমন পরিস্থিতি এর আগে কখনো দেখা যায়নি। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এর প্রভাবের বাইরে থাকলেও মস্কোর বর্তমান পরিস্থিতি বাসিন্দাদের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
গত এক মাসে রাশিয়ায় নজিরবিহীন ড্রোন অভিযান চালিয়েছে ইউক্রেন। গেল সপ্তাহের এক রাতেই দেশের ১২ অঞ্চলে অন্তত ৬৬০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করছে রুশ বাহিনী। যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় পরিসরে ড্রোন হামলার একটি ছিল এটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের লক্ষ্যবস্তু মূলত রাশিয়ার জ্বালানি ও সামরিক অবকাঠামো। তেল শোধনাগার, সংরক্ষণাগার, অস্ত্র কারখানা ও নৌঘাঁটিতে ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে মস্কোর যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করার কৌশল নিয়েছে কিয়েভ। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, এরইমধ্যে এর প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশের নানা অঞ্চলে পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। রাজধানী মস্কোতেও অনেক চালক দিনের পর দিন জ্বালানির সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে যাওয়া ক্রিমিয়ায় জ্বালানি বিক্রি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, সেখানে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা।
পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও। গত সপ্তাহের শেষে এক জরুরি বৈঠকে তিনি বলেন, দেশের গ্যাসোলিনের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে এসেছে, ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও ব্যবসায়ীরা।
একই বৈঠকে পুতিন জানান, ডিজেল রফতানিতে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় একটি বিশেষ টাস্কফোর্সও কাজ করছে। কৃষি উৎপাদনের ওপরও জ্বালানির ঘাটতির প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
রাশিয়ার এ অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ এতদিন ইউক্রেনের ড্রোন হামলাকে প্রকাশ্যে গুরুত্বহীন বলে তুলে ধরেছিল ক্রেমলিন। এখন সে হামলার অর্থনৈতিক প্রভাব স্বয়ং রুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্যেই উঠে এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে এক ধরনের কৌশলগত পালাবদলও স্পষ্ট। যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাবস্টেশন ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, এখন ইউক্রেন একই ধরনের কৌশল রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ও সামরিক রসদ পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রেও পড়েছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ড্রোন অভিযানের বিস্তৃতি ইউক্রেনকে নতুন করে কিছু এলাকা পুনর্দখলে সহায়তা করেছে এবং গত বছরের তুলনায় রাশিয়ার অগ্রগতি ধীর করেছে।
তবে এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও বিশ্লেষকদের ধারণা, ক্রেমলিন শিগগিরই নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করবে না। দীর্ঘদিন ধরে আপসহীন নেতা হিসেবে নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন পুতিন। ফলে ইউক্রেনে কোনো আপস বা বড় ধরনের ছাড় দেয়া তার জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
পশ্চিমা হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে রাশিয়ার নিহত ও আহত সেনার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে মস্কো ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করছে, যদিও পুরো অঞ্চল এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে নয়। এমন পরিস্থিতিতে স্পষ্ট বিজয় ছাড়া অন্য কোনো সমঝোতা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া পুতিনের ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী মহল এখনো বিশ্বাস করে, ইউক্রেনের পুরো দনবাস অঞ্চল দখল করা সম্ভব। তাই কয়েকটি তেল শোধনাগারে হামলা বা জ্বালানি সংকট যুদ্ধের কৌশল বদলে দেবে এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।