লাশ দাফন না করে কতদিন রাখা যায়? ইসলাম কী বলে
ফাইল ছবি
মৃত্যু মানুষের জীবনের অবধারিত পরিণতি। মৃত্যুর পর একজন মুসলমানের প্রতি জীবিতদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো দ্রুত গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের অপেক্ষা, বিদেশ থেকে মরদেহ আনা, ময়নাতদন্ত, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা অন্যান্য বাস্তব কারণে অনেক সময় দাফনে বিলম্ব হয়। আবার সমাজে এমন ধারণাও প্রচলিত রয়েছে যে, বিদেশে থাকা সন্তান না আসা পর্যন্ত কিংবা জুমার দিনের অপেক্ষায় লাশ রেখে দেওয়া উত্তম। এসব বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা কী? কোরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বিষয়টি জানা প্রয়োজন।
ইসলামের মূলনীতি: অযথা দাফনে বিলম্ব নয়
ইসলাম মৃত ব্যক্তির জানাজা ও দাফন যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তোমরা জানাজা দ্রুত সম্পন্ন করো। মৃত ব্যক্তি যদি নেককার হয়ে থাকে, তবে এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি সে অন্যরকম হয়, তবে তোমরা একটি অকল্যাণকে নিজেদের কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখবে।’ (সহিহ বুখারি: ১৩১৫)
অন্য হাদিসে নবীজি (স.) বলেন, ‘এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের হক পাঁচটি: সালামের জবাব দেওয়া, অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, তার জানাজার সঙ্গে যাওয়া, দাওয়াত কবুল করা এবং তার হাঁচির জবাব দেওয়া। (সহিহ বুখারি: ১২৪০: সহিহ মুসলিম: ২১৬২)
এসব হাদিসের ভিত্তিতে আলেমরা বলেন, শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া জানাজা ও দাফনে অযথা বিলম্ব করা সুন্নাহর পরিপন্থী।
কোরআনের শিক্ষা
মৃতদেহ দাফনের শিক্ষা মানবজাতি প্রথম পেয়েছে হাবিল ও কাবিলের ঘটনার মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন, যা মাটি খুঁড়ছিল, যাতে তাকে দেখাতে পারে, কীভাবে সে ভাইয়ের লাশ গোপন করবে।’ (সুরা মায়েদা: ৩১)
তাফসিরবিদরা বলেন, এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মৃত ব্যক্তিকে সম্মানজনকভাবে দাফন করা মানবজাতির জন্য আল্লাহপ্রদত্ত একটি মৌলিক বিধান।
লাশ কতদিন রাখা যাবে?
কোরআন ও সহিহ হাদিসে লাশ দাফনের জন্য এক দিন, তিন দিন বা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। ইসলামের মূলনীতি হলো-
- যত দ্রুত সম্ভব দাফন করতে হবে।
- অযথা বিলম্ব করা যাবে না।
- শরিয়তসম্মত ও অনিবার্য কারণ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিলম্ব করা বৈধ।
অর্থাৎ, ইসলামে প্রশ্নটি ‘কতদিন রাখা যাবে’ এটি নয়; বরং ‘কেন রাখা হচ্ছে’ এটিই মুখ্য বিবেচ্য বিষয়।
যেসব কারণে দাফনে বিলম্ব করা বৈধ
১. ময়নাতদন্ত বা আইনি তদন্ত: দুর্ঘটনা, হত্যাকাণ্ড বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় তদন্ত বা ময়নাতদন্ত প্রয়োজন হলে দাফনে বিলম্ব করা বৈধ।
২. নিকটাত্মীয়ের অপেক্ষা: যদি স্বল্প সময়ের মধ্যে বাবা-মা, সন্তান বা জীবনসঙ্গী এসে জানাজায় অংশ নিতে পারেন, তাহলে অল্প সময় অপেক্ষা করা যেতে পারে। তবে অযথা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা সুন্নাহসম্মত নয়। বিশেষ করে মরদেহে পরিবর্তন বা পচন ধরার আশঙ্কা দেখা দিলে আর বিলম্ব করা উচিত নয়।
৩. বিদেশ থেকে মরদেহ আনা: বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানরত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দূতাবাসের আনুষ্ঠানিকতা ও পরিবহন-সংক্রান্ত কারণে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় বিলম্ব একটি গ্রহণযোগ্য ওজর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৪. প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতি
যুদ্ধ, বন্যা, ভূমিকম্প কিংবা অন্য কোনো অনিবার্য পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক দাফন সম্ভব না হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিলম্ব করা যেতে পারে।
মৃত্যুস্থানের কাছেই দাফন করা উত্তম
সাধারণভাবে এবং অপ্রয়োজনীয় স্থানান্তর এড়িয়ে যে এলাকায় মৃত্যু হয়েছে, সেখানকার নিকটবর্তী কবরস্থানে দাফন করাই সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী। উহুদের যুদ্ধে শহীদদের স্বজনরা তাঁদের অন্যত্র নিয়ে যেতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁদের শাহাদাতের স্থানেই দাফনের নির্দেশ দেন। (জামে তিরমিজি ও সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত)
তবে প্রয়োজন বা গ্রহণযোগ্য ওজর থাকলে মরদেহ অন্য স্থানে স্থানান্তরেরও অবকাশ রয়েছে। তাই এটি সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ নয়।
তিন সময়ে দাফন না করাই উত্তম
উকবা ইবনে আমির (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) আমাদের তিন সময়ে নামাজ আদায় করতে এবং মৃতদের দাফন করতে নিষেধ করেছেন- সূর্য উদয়ের সময় থেকে তা উপরে না উঠা পর্যন্ত, ঠিক দুপুর বেলায় সুর্য পশ্চিম দিকে ঢলে না পড়া পর্যন্ত এবং সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় তা সম্পূর্ণ ডুবে না যাওয়া পর্যন্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩১৯২)
তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে এ সময়েও দাফন করা যেতে পারে।
জুমার দিনের অপেক্ষায় রাখা কি ঠিক?
আমাদের সমাজে অনেক সময় বৃহস্পতিবার মৃত্যু হলে জুমার দিন দাফনের জন্য অপেক্ষা করা হয়। কিন্তু কোনো দিনের বিশেষ ফজিলতের আশায় দাফন বিলম্বিত করার প্রমাণ কোরআন-সুন্নাহে নেই। তাই শুধু জুমার দিনের অপেক্ষায় লাশ রেখে দেওয়া সুন্নাহসম্মত নয়।
রাতে দাফন করা যাবে?
অনেকে মনে করেন, রাতে দাফন করা বৈধ নয়। বাস্তবে এ ধারণা সঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর যুগেও রাতে দাফনের ঘটনা ঘটেছে। তাই প্রয়োজন হলে রাতে দাফন করা জায়েজ। তবে কোনো অসুবিধা না থাকলে এবং জানাজায় অধিক মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে দিনের বেলায় দাফন করা উত্তম।
মরদেহ হিমাগারে রাখা যাবে?
বর্তমানে বিভিন্ন প্রয়োজনে মরদেহ হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। আইনি তদন্ত, ময়নাতদন্ত, বিদেশ থেকে স্বজনের আগমন বা অন্যকোনো অনিবার্য কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী মরদেহ সংরক্ষণ করা বৈধ। তবে শুধু সামাজিক রীতি, আবেগ বা অপ্রয়োজনীয় বিলম্বের উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন মরদেহ হিমাগারে সংরক্ষণ করা ইসলামের দ্রুত দাফনের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মৃতের অসিয়ত থাকলে
যদি কোনো ব্যক্তি এমন অসিয়ত করে যান, যার কারণে দাফনে অযথা বিলম্ব হয় এবং তা শরিয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী হয়, তাহলে সেই অসিয়ত বাস্তবায়ন করা বাধ্যতামূলক নয়। কারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স.)-এর নির্দেশ কোনো ব্যক্তিগত অসিয়তের ঊর্ধ্বে।
আলেমদের অভিমত
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, মৃত ব্যক্তির জানাজা ও দাফন যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করা সুন্নাহ। তবে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া বা অন্যকোনো শরিয়তসম্মত প্রয়োজন থাকলে প্রয়োজনীয় বিলম্বে অসুবিধা নেই। (আল-মাজমু)
ইমাম ইবনু কুদামা (রহ.) বলেন, মৃত ব্যক্তির দাফনে অযথা বিলম্ব করা উচিত নয়। তবে মৃতের স্বার্থ বা শরিয়তসম্মত প্রয়োজন দেখা দিলে সে অনুযায়ী বিলম্ব করা যেতে পারে। (আল-মুগনি)
আমাদের করণীয়
মৃত্যুর পর একজন মুসলমানের প্রতি সর্বোত্তম সম্মান হলো দ্রুত গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করা। আবেগ, সামাজিক রীতি বা প্রচলিত কুসংস্কারের কারণে দাফনে অযথা বিলম্ব করা উচিত নয়। তবে আইনি, চিকিৎসাগত বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণ দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিলম্ব করা যেতে পারে।
সংক্ষেপে, ইসলামে লাশ দাফনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। মূলনীতি হলো- শরিয়তসম্মত ওজর না থাকলে মৃত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা। এটিই রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ এবং ফুকাহায়ে কেরামের নির্দেশনা।