কবর জেয়ারতে যা করবেন, যা থেকে সতর্ক থাকবেন
ফাইল ছবি
মৃত্যু এক অনিবার্য বাস্তবতা। প্রতিটি মানুষকেই একদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারের যাত্রা শুরু করতে হবে। তাই ইসলাম মানুষকে কবর জেয়ারতের প্রতি উৎসাহিত করেছে, যাতে আখেরাতের কথা স্মরণ হয়, অন্তর নরম হয় এবং নেক আমলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তবে কবর জেয়ারতের ক্ষেত্রে অজ্ঞতা, কুসংস্কার কিংবা আবেগের কারণে অনেক সময় এমন কিছু কাজ করা হয়, যা কোরআন-সুন্নাহসম্মত নয়। তাই একজন মুসলমানের জানা প্রয়োজন- কবর জেয়ারতে গিয়ে কী করা উচিত এবং কোন কাজগুলো থেকে বিরত থাকা উচিত।
কেন কবর জেয়ারত করবেন?
ইসলামের শুরুর দিকে রাসুলুল্লাহ (স.) কবর জেয়ারত করতে সাময়িকভাবে নিষেধ করেছিলেন। পরে মানুষের আকিদা সুদৃঢ় হলে তিনি সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে বলেন-
‘আমি তোমাদের কবর জেয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা কবর জেয়ারত করতে পারো...।’ (সহিহ মুসলিম: ৯৭৭)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, কবর জেয়ারত মানুষের দুনিয়ার মোহ কমিয়ে দেয় এবং মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৫৭১)
কবর জেয়ারতে গিয়ে যা করবেন
১. মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করবেন
কবর জেয়ারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও মাগফিরাত কামনা করা।
২. কবরস্থানে প্রবেশ করে সালাম দেবেন
রাসুলুল্লাহ (স.) কবরস্থানে প্রবেশ করে এ দোয়া পড়তেন- السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَلَاحِقُونَ أَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمْ الْعَافِيَةَ
অর্থ: ‘হে মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীগণ! আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ আমরাও একদিন আপনাদের সঙ্গে মিলিত হব। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের এবং আপনাদের জন্য নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করি।’ (সহিহ মুসলিম: ৯৭৫)
৩. আখেরাতের কথা স্মরণ করবেন
কবর জেয়ারতের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করা, গুনাহ থেকে তওবা করা এবং নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ হওয়া।
৪. বিনয় ও ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখবেন
কবরস্থানে উচ্চস্বরে কথা বলা, হাসি-ঠাট্টা বা অপ্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড পরিহার করে নীরবতা ও মর্যাদা বজায় রাখা উচিত।
৫. মৃতের জন্য দান-সদকা করতে পারেন
মৃত ব্যক্তির সওয়াবের উদ্দেশ্যে গরিব-অসহায়দের দান করা, খাদ্য বিতরণ বা অন্যান্য নেক কাজ করা বৈধ। হাদিসে এসেছে, এক সাহাবি তাঁর মৃত মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করার অনুমতি চাইলে রাসুলুল্লাহ (স.) তা অনুমোদন করেন। (সহিহ বুখারি: ১৩৮৮; সহিহ মুসলিম: ১০০৩)
কবর জেয়ারতে গিয়ে যা করবেন না
১. কবরবাসীর কাছে কিছু চাইবেন না
মৃত ব্যক্তি কারও উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা রাখেন না। তাই সন্তান, রিজিক, রোগমুক্তি বা বিপদ থেকে উদ্ধারসহ যেকোনো প্রয়োজন কবরবাসীর কাছে চাওয়া জায়েজ নয়। সকল প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহর কাছেই করতে হবে। ‘তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে, যে কেয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না?’ (সুরা আহকাফ: ৫)
২. কবরকে সেজদা, রুকু বা চুম্বন করবেন না
কবরের সামনে সেজদা করা, রুকু করা, চুম্বন করা বা ইবাদতের কোনো নিদর্শন প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘সাবধান, তোমরা কবরকে সেজদার স্থান বানিয়ো না।’ (সহিহ মুসলিম: ৫৩২)
৩. কবর তাওয়াফ বা আলোকসজ্জা করবেন না
কাবা শরিফ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর তাওয়াফ করা বৈধ নয়। একইভাবে কবরে মোমবাতি, আগরবাতি বা আলোকসজ্জা করে বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
৪. কবরের নামে মানত করবেন না
কবর বা কোনো মৃত ব্যক্তির নামে গরু, ছাগল, টাকা-পয়সা বা অন্য কিছু মানত করা জায়েজ নয়। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করতে চান, তবে তা সরাসরি গরিব-অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করবেন।
৫. দোয়া করবেন আল্লাহর কাছে
দোয়া একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই করতে হবে। কবরবাসীর কাছে নয়, বরং মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত কামনা করতে হবে।
৬. বিলাপ ও মাতম করবেন না
কবরের পাশে হায়-হুতাশ করা, বুক চাপড়ানো বা জাহেলি যুগের মতো মাতম করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
৭. কবরের ওপর বসবেন না বা পা দিয়ে মাড়াবেন না
রাসুলুল্লাহ (স.) কবরের ওপর বসতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন- ‘তোমাদের কেউ জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর বসা তার জন্য এর চেয়ে উত্তম, কবরের ওপর বসার চেয়ে।’ (সহিহ মুসলিম: ৯৭১)
৮. সেলফি বা ভিডিও ধারণ থেকে বিরত থাকবেন
কবরস্থানে সেলফি তোলা, ভিডিও ধারণ করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের উদ্দেশ্যে ছবি তোলা কবর জেয়ারতের মূল উদ্দেশ্য ও ভাবগাম্ভীর্যের পরিপন্থী। তাই এসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।
নারীদের কবর জেয়ারতের বিধান
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক আলেমের মতে, নারীরা যদি পর্দা রক্ষা করেন, বিলাপ না করেন এবং কেবল আখেরাত স্মরণের উদ্দেশ্যে কালেভদ্রে কবর জেয়ারত করেন, তবে তা বৈধ। তবে যেখানে ফিতনার আশঙ্কা বা শরিয়তবিরোধী কাজের পরিবেশ থাকে, সেখানে না যাওয়াই উত্তম। (সুনানে আবু দাউদ: ৩২৩৬; আলবাহরুর রায়েক: ২/১৯৫; রদ্দুল মুহতার: ২/২৪২; ফতোয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত : ৫/২১১-২২২)
আমাদের করণীয়
কবর জেয়ারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং জীবন্ত নসিহত। এটি মানুষের অন্তরকে নরম করে, দুনিয়ার মোহ কমায় এবং আখিরাতের প্রস্তুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই কুসংস্কার, বিদআত ও শরিয়তবিরোধী কাজ থেকে বিরত থেকে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী কবর জেয়ারত করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।