ম্যাক্রোঁ শিবিরে ভাঙনের প্রতীক কাজেনভ পরিবার
ছবি: সংগৃহীত
ফ্রান্সে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্তি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময় ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে এখন মতাদর্শ ও নেতৃত্বের প্রশ্নে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে কাজেনভ পরিবার। ২০১৭ সালে পরিবারের প্রায় সব সদস্যই ম্যাক্রোঁর উত্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তার প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু এক দশক পর তারা তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম হাফপোস্ট ফ্রান্স জানিয়েছে, পরিবারের প্রধান জ্যঁ-রেনে কাজেনভ একসময় সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ২০১৭ সালে ম্যাক্রোঁর দল লা রিপাবলিক আঁ মার্শ থেকে গের্স অঞ্চলের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই সময়ে তার মেয়ে মার্গেরিত কাজেনভ প্রেসিডেন্টের এলিসি প্রাসাদে সামাজিক সুরক্ষা ও সরকারি অর্থব্যবস্থা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী জ্যাঁ কাস্তেক্সের কার্যালয়েও একই দায়িত্ব পালন করেন। ছেলে পিয়ের কাজেনভ ২০২০ সালে প্রেসিডেন্টের উপ-চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২০২২ সালে ম্যাক্রোঁপন্থি রেনেসাঁ দলের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
তবে ২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখে পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। জ্যঁ-রেনে কাজেনভ এবং তাঁর ছেলে পিয়ের বর্তমানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আতালের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আতালের নির্বাচনি প্রস্তাবকে তারা দেশের অর্থনীতি ও সরকারি অর্থব্যবস্থার জন্য স্পষ্ট, সাহসী ও বিশ্বাসযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। জ্যঁ-রেনে কাজেনভ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ফ্রান্সের প্রয়োজন গ্যাব্রিয়েল আতালের মতো উদ্যমী, নতুন চিন্তাধারার এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখতে সক্ষম একজন নেতা।
অন্যদিকে পিয়ের কাজেনভের জীবনসঙ্গী ও বর্তমান সরকারের মুখপাত্র মোদ ব্রেজোঁ সমর্থন দিচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপকে। তিনি ফিলিপের নির্বাচনি সমাবেশেও অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে একই পরিবারের দুই সদস্য ভিন্ন দুই সম্ভাব্য প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বিষয়টি ফরাসি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরিবারের আরেক সদস্য, মার্গেরিত কাজেনভের স্বামী এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অরেলিয়াঁ রুশো অভিবাসন আইন নিয়ে মতবিরোধের কারণে ম্যাক্রোঁ সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তিনি বামপন্থি দল প্লাস পাবলিক-এ যোগ দিয়ে রাফায়েল গ্লুকসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন। মার্গেরিত কাজেনভও ২০২৬ সালে সেই রাজনৈতিক দলে যোগ দেন এবং বর্তমানে গ্লুকসমানের সম্ভাব্য নির্বাচনি কর্মসূচি ও নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কাজেনভ পরিবারের এই রাজনৈতিক বিভাজন কেবল একটি পরিবারের ভিন্নমত নয়; এটি ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক আন্দোলনের বর্তমান অবস্থারও প্রতিফলন। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এখনও ২০২৭ সালের নির্বাচনের জন্য কোনো উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করেননি। ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আতাল ও এদুয়ার ফিলিপের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বামপন্থি নেতা রাফায়েল গ্লুকসমানও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০১৭ সালে ম্যাক্রোঁ যে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলেছিলেন, তা আজ আর আগের মতো ঐক্যবদ্ধ নেই। একসময় একই রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী কাজেনভ পরিবারের সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে অবস্থান সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।