চরফ্যাশনের ১২ শহীদ পরিবারের খোঁজ নেয় না কেউই

চরফ্যাশনের ১২ শহীদ পরিবারের খোঁজ নেয় না কেউই

সংগৃহীত ছবি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দিবস। এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময় শহীদ হন চরফ্যাশন উপজেলার ১২ যুবক। এরা সকলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

এরা ছিলেন কলেজ-মাদ্রাসাছাত্র, দিনমজুর, রিকশা, ভ্যানচালক ও হোটেল কর্মচারী। সংসারের অভাব দূর করতে উন্নত জীবনের আশায় রাজধানীতে পাড়ি জমিয়ে প্রাণ হারান একে একে ১২ জন। ঘরে ফিরেছেন কফিনবন্দি হয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আন্দোলনে একদিনে এতো প্রাণ ঝড়েনি অন্য কোনো উপজেলার মানুষের।

চরফ্যাশন উপজেলার ইউএনও, সমাজসেবা কর্মকর্তা, স্বাক্ষরিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চরফ্যাশন উপজেলার শহীদদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিহত ১২ জনের মধ্যে রয়েছেন- চরফ্যাশন উপজেলার, ফুটপাতের দোকানি মো. সিয়াম (১৫), বেসরকারি চাকরিজীবী মো. রাকিব মোল্লা (২৫), কোম্পানির বিপণনকর্মী মো সোহাগ (১৭), রাজমিস্ত্রি মো. বাহাদুর হোসেন মনির (১৮), গার্মেন্টস কর্মী মো ফজলু (২৮), রাজমিস্ত্রি মো ফজলে রাব্বি (২০), ইন্টারনেট কর্মী মো. হাসনাইন (২৫), কলেজ শিক্ষার্থী মো. মমিন (১৯), ট্রাক চালক মো. হোসেন (২৫), দোকান কর্মচারী মো. হাবিবুর রহমান (২৯), মুদি দোকানের কর্মচারী মো. ওমর ফারুক (১৬) এবং দর্জি মো. তারেক (১৮)।

স্বজনদের গগনবিদারি বিলাপ আজও থামেনি। ৫ আগস্ট তাদের কাছে এক বিভীষিকাময় তারিখ। ঘটনার ২বছর পেরিয়ে গেছে সেই ট্র্যাজেডির, তবু স্বজন হারানোর শোক ভুলতে পারেনি শহীদ পরিবারের সদস্যরা। সেদিনের ঘটনায় কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ ভাই, কেউবা সন্তান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক পরিবারই আজ নিদারুণ সংকটে। 

সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা। জীবিকার সন্ধানে শহরে যাওয়া সেই মানুষগুলোর আর কেউ ফেরেনি। তারা রয়ে গেছে শুধুই স্মৃতির বুকে। ঘাতকের বুলেটের আঘাতে নির্মমভাবে শহীদের দাফন সম্পন্ন হয় নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে। এসব হত্যাকান্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে, যার প্রত্যেকটির প্রধান আসামি দেশের সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২ বছর পুর্ণ হতে চললেও হত্যাকান্ডে জড়িতদের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ স্বজনদের।

কেমন আছে শহীদদের পরিবারগুলো?

চরফ্যাশন উপজেলার জাহানপুর ইউনিয়নের আটকপাট গ্রামের শহীদ ফজলুর রাব্বি স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বলেন, স্বামী কইছিলো আর ঢাকায় থাকমুনা বাড়ি গিয়ে একটু জমি কিনইয়া নতুন ঘর করুম। মাইয়াডারে একটা ভালা স্কুলে পড়ামু। আমার অবুঝ মাইয়াডার ভবিষ্যৎ এখন কি। কারে আব্বা কইয়া ডাকবে। ঢাকার মিরপুর ১৩ নম্বরের মন্দিরের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত গার্মেন্টস কর্মী ফজলুর রহমানের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে ৭ মাস বয়সী একমাত্র সন্তানকে নিয়ে এখন দিশেহারা।

উপজেলার দুলারহাট থানার নীলকমল ইউনিয়নের মো. হোসেনের (২৫) মা রিনা বেগম। ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার চাঁদ উদ্যান গেটে শিক্ষার্থী-পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মো. হোসেন (২৫)। 

তার মা রিনা বেগম বলেন ,আমার স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে ঢাকাতে চলে যাই। সেখানে গিয়ে ইট ভেঙ্গে টাকা উপার্জন করে সংসার পরিচালনা করেছি। ছেলে ট্রাক চালাতে শুরু করে। তার দুই সন্তান আছে। ছেলের কর্মের টাকা আর আমার ইট ভাঙ্গা টাকা দিয়ে কোন রকম পরিবারের ৫ সদস্য নিয়ে জীবন পার করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। কিভাবে জীবন পার করব; দুই নাতনি ও পুত্রবধূকে নিয়ে। কোন কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছি না।

উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের তারেক গত ৫ই আগস্ট সকাল ১১টার দিকে নাস্তা করে টেইলর্সে যাওয়ার সময় বেলা ১২টা ৩৭ মিনিটের পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাচ্ছিল সহকর্মীরা। তারেককে না পেয়ে তাদের মনে সন্দেহ জাগে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এসে সব বেওয়ারিশ লাশের ছবি তুলে স্বজনদেরকে পাঠানো হয়। সেই ছবি দেখে তারেকের মরদেহসনাক্ত করেন তারেকের বাবা মো রিয়াজ। সে বলে আমি একটা ছেলে পাইয়া আল্লার কাছে বড় খুশি হইছিলাম। কিন্তু আল্লায় বুক থেকে ছিনাইয়া লইয়া গেল। আজ দুই বছর হইছে বাবার মুখটা দেখি না। এখনো মনে হয় ঢাকা থেকে বাড়িতে আইবো। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।

চরফ্যাশনের নুরাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর তোফাজ্জল গ্রামের মিলন ফরাজী বাড়ির শহীদ ওমর ফারুকের মা ইয়ানুর বেগমের এখনও কান্না থামেনি। সন্তানহারা এই মা শোকে কাতর হয়ে আছেন। ছেলের ছবি বুকে নিয়ে কাঁদছেন তিনি। তার তিন সন্তানের মধ্যে শহীদ ওমর ফারুক দ্বিতীয়। অভাবের কারণে প্রায় ৫ বছর আগে ঢাকায় যান। ওমর ফারুকে একটি দোকানের কর্মচারীর কাজে দেন। থাকতেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। সবাই মিলে কাজ করায় ভালোই চলছিল তাদের সংসার।আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অংশ নেয় ১৬ বছরের কিশোর ওমর ফারুক।৪ আগস্ট ওমর ফারুক মোহাম্মদপুরের ওভারব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে।ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে সন্তানহারা মা ইয়ানুর বেগম সন্তানের কথা ভুলতে পারেন না।

চরফ্যাসন উপজেলার জাহানপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সেলিম মাঝির ছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। চার মাস আগে মাত্র ২০ বছর বয়সে শখ করে ধুমধাম করে বিয়ে দেন বাবা। দুই মাস পর নতুন সংসার গোছাতে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ নেন। নতুন বউকে কথা দিয়েছিলেন, তার জন্য নতুন শাড়ি নিয়ে আসবেন। কিন্তু ফেরা হলো না তার। ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিল প্রাণ। গুলিবিদ্ধ মো রাব্বির মা জয়তুন বেগম। বাড়িতে গিয়ে শহীদ  রাব্বির খোজ নিতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সে।এভাবেই এখনো চরফ্যাশনের শহীদ পরিবারগুলোয় চলছে কান্না-আহাজারি। কেউ কাঁদছে স্বামী হারিয়ে, কেউবা সন্তান হারিয়ে। এই কান্না যেন থামার নয়।

শহীদদের সেই কাঙিক্ষত বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে উঠেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ সিয়ামের ভাই বলেন, শহীদরা তাদের রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে যে বৈষম্যহীন কাঙ্ক্তি বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিল তা হয়নি। সেই বৈষম্য রয়েই গেল। সরকারের কাছে আমাদের শহীদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশা হলো- বিচার চাই।

চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আফরোজ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি শহীদ হয়েছেন ভোলার সন্তানরা। এর মধ্যে চরফ্যাশন উপজেলার ১২ জন। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ক্ষতি কখনোই পূরণ হবার নয়। তারপরও সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকার চেষ্টা করা হয়েছে। চরফ্যাশন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও যে কোনো প্রয়োজনে প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে।