‘মুক্তি পেলে সেনাপ্রধানের সঙ্গে বিবাদে জড়াবেন না ইমরান খান’
ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মুক্তি পেলে সেনাবাহিনী বা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে সংঘাতে জড়াবেন না বলে জানিয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি। বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে ইমরান খান নিজের ক্ষোভ ও কষ্ট নিয়ন্ত্রণ করবেন।
বুখারি বলেন, ‘ইমরান খান যদি কাল মুক্তি পান, তাহলে তিনি এমন কিছু করবেন না, যা দেশের ক্ষতি করে।’ তাঁর মতে, এর অর্থ হলো সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে না গিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া।
ইমরান খানের দল ও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ চলছে। ২০২৩ সালে ইমরান গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তাঁর সমর্থকেরা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তাঁর কারাবন্দিত্বের জন্য দায়ী করে আসছেন। ইমরান নিজেও অতীতে মুনিরের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেছেন।
তবে বুখারির সাম্প্রতিক বক্তব্যকে সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তিনি মুনিরকে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তিনি চাইলে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির পথ তৈরি করতে পারেন।
তবে পিটিআই ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে কোনো আলোচনা চলছে না বলেও জানান বুখারি। পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি। সামরিক বাহিনী অতীতে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সরকারও বলে আসছে, ইমরানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আদালতের বিষয়।
হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ
এর মধ্যে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট মঙ্গলবার ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারাগার থেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্লেষকেরা এই সিদ্ধান্তকে ইমরান ও তাঁর দলের সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বের উত্তেজনা কমানোর সম্ভাব্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
বুখারি আদালতের সিদ্ধান্তকে ‘নতুন আশার আলো’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হাসপাতালের বাইরে দলীয় কর্মী ও নেতাদের জমায়েত না হওয়ার বিষয়ে আদালতের নির্দেশ পিটিআই মেনে চলবে বলেও জানান তিনি। তবে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ইমরানকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়নি। এর আগে কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারের একটি চ্যালেঞ্জ কারিগরি কারণে খারিজ হয়েছিল। সরকার বিষয়টি আবার আদালতে তুলবে কি না, তা তখনও স্পষ্ট ছিল না।
ইমরান খান ৭৩ বছর বয়সী। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় একাকী বন্দিত্বে রাখা হয়েছে। পিটিআইয়ের অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেফতারর এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন। দলটির সাংগঠনিক কাঠামোর বড় অংশও কর্তৃপক্ষের অভিযানে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, ইমরান কারাগারে থাকা অবস্থায় পিটিআইয়ের নেতৃত্ব রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা বা সমঝোতায় অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী কর্মসূচি
সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কের উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা দেখা দিলেও সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি থেকে সরে আসছে না পিটিআই। বুখারি জানিয়েছেন, ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়া হোক বা না হোক, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী পদযাত্রা করবে দলটি।
কর্মসূচিতে ইমরানের আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা, তাঁর পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, আইনজীবী ও দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া, মামলাগুলোর দ্রুত শুনানি এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর মুক্তির দাবি জানানো হবে।
বুখারি আরও জানান, গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে থাকা পিটিআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতারাও কর্মসূচিতে অংশ নেবেন অথবা তা সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখবেন।
ইমরান খান ২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে একাধিক মামলায় আইনি লড়াই করছেন। এসব মামলার মধ্যে রাষ্ট্রীয় উপহার, সামরিক ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় সহিংস হামলায় উসকানি এবং বেআইনি বিয়ের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর অধিকাংশ সাজা স্থগিত বা বাতিল হয়েছে এবং কয়েকটি মামলায় আপিল এখনো চলমান। ইমরান সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এদিকে, গত বছরের নভেম্বরে ইমরানের নামে দেওয়া বক্তব্যে তিনি মুনিরের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ তুলেছিলেন এবং বলেছিলেন, চাপের মুখেও তিনি নতি স্বীকার করবেন না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর নিজের পক্ষ থেকে নতুন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে ঘনিষ্ঠ সহযোগী বুখারির এই বক্তব্য ইমরানের বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স