রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসে ক্যাম্পে নানা কর্মসূচি, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি

রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসে ক্যাম্পে নানা কর্মসূচি, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি

সংগৃহীত ছবি

রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সমাবেশ, র‌্যালি, আলোচনা ও স্মরণসভাসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা এবারও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন।

দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে ২০১৭ সালের সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি নিজ ভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার দাবি তুলে ধরেন রোহিঙ্গারা। উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে পৃথকভাবে এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ক্যাম্প-১ ইস্ট ও ১ ওয়েস্টের লম্বাশিয়া-চারমুখা এলাকা থেকে অংশগ্রহণকারীরা ক্যাম্প-৪-এর খেলার মাঠে সমবেত হন। ক্যাম্প-২ ইস্ট, ২ ওয়েস্ট ও ক্যাম্প-৬-এর কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে মফিজের মাঠে। ক্যাম্প-৪ ও ৪ এক্সটেনশনের ফুটবল মাঠেও আয়োজন করা হয় পৃথক কর্মসূচির।

এছাড়া ক্যাম্প-৭ ও ৯ থেকে একটি র‌্যালি প্রধান সড়ক দিয়ে ক্যাম্প-৪-এর দিকে যায়। ক্যাম্প-১১-এর মেইন ব্লক এ ও সাব-ব্লক এ-১, ক্যাম্প-১২-এর মেইন ব্লক এ-তে সিআইসি অফিসের পাশে, ক্যাম্প-১৩-এর ব্লক এ-০২-এর ফুটবল মাঠে, ক্যাম্প-২২-এর সেন্ট্রাল এমপিসিতে, ক্যাম্প-২৪ ও ২৫-এর জন্য ক্যাম্প-২৪-এর জানাজা মাঠে এবং এনআরসি ক্যাম্পের ব্লক-ই কমিউনিটি সেন্টারে কর্মসূচি পালিত হয়।

সমাবেশ ও র‌্যালিতে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ নিরাপদ প্রত্যাবাসনসহ বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন বহন করেন। তারা ‘গণহত্যার বিচার চাই’, ‘নিরাপদ প্রত্যাবাসন চাই’ এবং ‘নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসের এবারের কর্মসূচিতে তাই জোরালোভাবে উঠে এসেছে- নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।

রোহিঙ্গা সংগঠন ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ (ইউসিআর)-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অংশ নেন। বক্তারা ২০১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা, নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতির বিচার এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার দাবি জানান। বক্তারা বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য ও রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ২০১৭ সালের গণহত্যার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গারা এখনো ন্যায়বিচার পাননি। তারা নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যেতে চান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিশ্চিত এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

৮-এপিবিএনের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সমাবেশকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এপিবিএনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাখাইনে চলমান সংঘাতের কারণে নতুন করে আরও দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউসিআরের নেতারা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ জন্য আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীজনদের সমন্বয়ে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতারাও মনে করছেন, শুধু সীমান্তের ওপারে মানুষ পাঠিয়ে দিলেই প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হবে না। প্রত্যাবাসনের আগে রাখাইনে চলমান সংঘাত বন্ধ, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ, জমি ও বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।