প্লাস্টিক থেকে প্রোটিনসমৃদ্ধ বিস্কুট!

প্লাস্টিক থেকে প্রোটিনসমৃদ্ধ বিস্কুট!

ছবি: আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি

প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি বিস্কুট! শুনতে রসিকতা মনে হলেও বিজ্ঞানী ও খাদ্য গবেষকেরা সত্যিই প্লাস্টিক বর্জ্যকে রূপান্তর করে থ্রিডি প্রিন্টেড খাবার তৈরির একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।শুরুটা হয়েছে কুকি বা বিস্কুট দিয়ে। ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে নাসার অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে বলে জানা গেছে।

তবে প্লাস্টিক সরাসরি খাওয়া যাবে না। কারণ, এটি মানুষের শরীরের জন্য বিষাক্ত। তাই প্লাস্টিককে খাবারে পরিণত করার আগে ব্যবহার করা হচ্ছে উন্নত জৈব পুনর্ব্যবহার বা বায়োরিসাইক্লিং প্রযুক্তি।

গবেষকেরা জানান, সবচেয়ে প্রচলিত প্লাস্টিকগুলোর একটি হলো পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট বা পিইটি। কোমল পানীয় ও পানির বোতলসহ বিভিন্ন একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরিতে এই প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়।

এই প্লাস্টিককে খাবারের উপযোগী উপাদানে রূপান্তর করতে গবেষকেরা পিইটি প্লাস্টিকের সঙ্গে ফেলে দেওয়া ভুট্টাগাছের ডাঁটা, পাতা ও অন্যান্য জৈব উপাদান ব্যবহার করেন। এসব উপাদানকে ‘অক্সিডেটিভ হাইড্রোথার্মাল ডিসলিউশন’ নামের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়।

এই প্রক্রিয়ায় উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানি এবং অক্সিজেন ব্যবহার করে কঠিন উপাদানগুলোকে ভেঙে এমন ক্ষুদ্র যৌগে পরিণত করা হয়, যা অণুজীব গ্রহণ করতে পারে।

এরপর ভেঙে যাওয়া প্লাস্টিক যৌগের সঙ্গে বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট যোগ করা হয়। জিনগতভাবে প্রকৌশলীকৃত এসব অণুজীব প্লাস্টিক থেকে তৈরি উপজাতকে গ্রহণ করে তা নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ জৈব পদার্থে রূপান্তর করে। এই জৈব পদার্থে থাকে প্রোটিন, চর্বি ও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন শর্করা।

পরে ওই উপাদানকে পেস্টে পরিণত করে পরিশোধন ও স্বাদ যোগ করা হয়। এরপর সেটি থ্রিডি ফুড প্রিন্টারে দেওয়া হয়। প্রিন্টারটি স্তরে স্তরে পেস্ট বের করে পরিচিত খাবারের আকৃতি তৈরি করে, যেমন কুকি। সবশেষে সেটি বেক বা অন্য প্রক্রিয়ায় শক্ত করে খাবার হিসেবে প্রস্তুত করা হয়।

এই গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি কার্বনডেলের অণুজীববিজ্ঞানী ড. লাহিরু জায়কোডি।

দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, তার গবেষণাগার মূলত প্লাস্টিককে পুনর্ব্যবহার করে মূল্যবান পণ্যে রূপান্তরের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। একপর্যায়ে তারা ভাবেন, এই প্রযুক্তি খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা যায় কি না। তার ভাষায়, প্লাস্টিকও কার্বন দিয়ে তৈরি, খাদ্যও কার্বনভিত্তিক।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিজেদের তৈরি কুকি খেয়ে দেখেননি। মানুষের ওপর পরীক্ষার অনুমোদন না পাওয়ায় তারা কুকির স্বাদ পরীক্ষা করতে পারেননি। যদিও কুকির ঘ্রাণ বেশ ভালো বলে মূল্যায়ন পেয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির এক সভায় গবেষণাটি উপস্থাপনের আগে জায়কোডি বলেন, মানুষের ওপর পরীক্ষার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকায় তারা এখনো কুকি খাননি।

কেন নভোচারীদের জন্য এই খাবার?

প্লাস্টিক থেকে তৈরি খাবারের ধারণা পৃথিবীর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা কঠিন হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে এই প্রযুক্তির বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

বিশেষ করে, মঙ্গল গ্রহে যাওয়া বা ভবিষ্যতে সেখানে মানুষের বসতি স্থাপনের মতো দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে খাবারের সংকট মোকাবিলায় এটি কাজে লাগতে পারে।

জায়কোডি বলেন, একজন নভোচারীর মঙ্গল গ্রহে যাওয়া ও ফিরে আসতে প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের কাছে থাকা প্রতিটি উপকরণই সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে হবে।

এই প্রযুক্তি সফল হলে মহাকাশযানে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, বিভিন্ন সরঞ্জামের মোড়ক কিংবা অব্যবহৃত প্লাস্টিক উপকরণ পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্যে পরিণত করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু মহাকাশেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর চরম ও প্রতিকূল পরিবেশেও এ ধরনের খাবার কাজে লাগতে পারে। যেমন সাবমেরিনে দীর্ঘদিন অবস্থান কিংবা দুর্যোগকবলিত এলাকায় খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।

জায়কোডির মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে খাদ্যের চাহিদা ৩৫ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সময়ে বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তার বিশ্বাস, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অণুজীবের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে তৈরি এই কুকি উৎপাদনে প্রতি কেজিতে প্রায় ৬০ মার্কিন ডলার খরচ হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। তবে গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হলে এটি টেকসই খাদ্য উৎপাদনের নতুন পথ খুলে দিতে পারে।