পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস): নামের পরিবর্তনের মূল বিষয়

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস): নামের পরিবর্তনের মূল বিষয়

সংগৃহীত ছবি

উইলিয়াম শেক্সপিয়রের Romeo and Juliet নাটকে জুলিয়েট এমন একটি নামের সমস্যা নিয়ে ভাবেন, যা তার ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি চান, তার প্রিয় মানুষ রোমিওর সঙ্গে যুক্ত ‘Montague’ নামটি যেন তার ভালোবাসা থেকে আলাদা হয়ে যায়। তিনি ভাবেন—একটি নামেরই বা কী এমন বিশেষত্ব আছে?

‘গোলাপকে অন্য কোনো নামেই ডাকা হোক না কেন, তার সুগন্ধ একই রকম মিষ্টি থাকবে।’ 

কোনো রোগের নামকরণ ঐতিহ্যগতভাবে অনেকটাই এলোমেলোভাবে হয়েছে। নামকরণের সময় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের ওপর এর প্রভাব খুব কমই বিবেচনা করা হয়েছে, অথচ একবার কোনো নাম প্রচলিত হয়ে গেলে তা প্রায় চিরস্থায়ীভাবেই থেকে যেতে পারে। কিছু রোগের নাম আবিষ্কারক বা রোগটির প্রচার ও পরিচিতি ঘটানো ব্যক্তির নামে রাখা হয়েছে। রোগ নির্ণয়ের আধুনিক প্রযুক্তি সহজলভ্য না থাকার সময় এবং রোগের কারণ অজানা থাকার যুগে এ ধরনের ব্যক্তির নামানুসারে রোগের নামকরণ কার্যকর ছিল।

তবে বর্তমানে রোগের নামকরণে এমন নাম ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা রোগটির শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য, রোগতত্ত্ব এবং রোগ সম্পর্কে আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে প্রতিফলিত করে। এর ফলে নামের অনেক সমস্যা এড়ানো যায়—বিশেষ করে রোগটির প্রকৃতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি এবং রোগ সম্পর্কে ভুল বা বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কমে। একই সঙ্গে এমন কিছু নাম এড়ানোর চাপও রয়েছে, যেগুলোকে নেতিবাচক বা অবমাননাকর হিসেবে দেখা হতে পারে; যেমন— ‘Middle East Respiratory Syndrome, Monkeypox’ বা ‘Mad Cow’s disease’। রোগের নামকরণে রোগীসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামতও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নামকরণ নিয়ে সমস্যায় থাকা একটি রোগ হলো polycystic ovary syndrome (PCOS)—বিশেষ করে এই রোগে আক্রান্ত নারীদের জন্য। Polycystic ovary syndrome প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের মধ্যে একটি অত্যন্ত সাধারণ endocrine disorder। এটি বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সমন্বিত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

প্রাথমিকভাবে এই রোগটি ‘Stein-Levinthal syndrome’ নামে পরিচিত ছিল—এই রোগের দুইজন বিশিষ্ট প্রবক্তার নামানুসারে। পরবর্তী কয়েক দশকে ‘polycystic ovary syndrome’ নামটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়, কারণ তখন রোগটির hormonal consequences সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ultrasound-এর মাধ্যমে নিয়মিতভাবে ovarian morphology পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল।

এখানে সবচেয়ে পরিচিত সমস্যাটি হলো ‘polycystic ovaries’ শব্দটি। এই নামটি এখন ভুল ও বিভ্রান্তিকর বলে বিবেচিত হয়। কারণ আমরা এখন জানি, ultrasound-এ দেখা এসব গঠন আসলে cyst নয়; এগুলো হলো  arrested follicles বা পরিপক্বতা-প্রাপ্তিতে থেমে থাকা follicle, যার মধ্যে oocyte থাকে। উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এই oocyte পরিপক্ব হতে পারে এবং embryo তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া ‘polycystic’ appearance-যুক্ত ovary কোনো নির্দিষ্ট রোগের বৈশিষ্ট্য নয়। সুস্থ বা PCOS-এ আক্রান্ত নন এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও এ ধরনের ovarian morphology দেখা যেতে পারে, বিশেষ করে কিশোরীদের মধ্যে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো—PCOS-কে প্রথমদিকে মূলত একটি  gynecological disease হিসেবে দেখা হতো, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মাসিকের অনিয়ম এবং subfertility বা সন্তান ধারণে সমস্যা। কিন্তু বর্তমানে আমরা জানি যে PCOS একটি  reproductive, cardiometabolic, dermatologic এবং psychological condition।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন diagnostic criteria ও treatment recommendation ব্যবহারের কারণে রোগ নির্ণয়ে প্রায়ই বিলম্ব হয়। এর ফলে রোগীর অসন্তুষ্টি, খারাপ clinical outcome এবং মানসিক distress বৃদ্ধি পেতে পারে।

বর্তমান diagnostic features-গুলোকেও অনেক নারী বিভ্রান্তিকর ও আপত্তিকর বলে মনে করেন। কারণ এগুলোতে  সামাজিক নেতিবাচক ধারণাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে, PCOS-এর গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য বৈশিষ্ট্য—যেমন: insulin resistance বৃদ্ধি, diabetes mellitus,cardiovascular events-এর ঝুঁকি—যেগুলো ovarian function-এর বাইরে স্বাধীনভাবেও দেখা দিতে পারে, সেগুলো নামের মধ্যে প্রতিফলিত হয় না।

PCOS-এর natural history সম্পর্কেও এখন আমাদের ধারণা অনেক বেশি পরিষ্কার। এটি শুধু ‘polycystic ovaries’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। 

গত এক দশক ধরে PCOS-এর নাম পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। 

পরবর্তীতে একটি expert advisory panel, health professionals ও consumers-এর আন্তর্জাতিক survey এবং stakeholder workshop-ও একই ধরনের সুপারিশের দিকে ইঙ্গিত করেছে।

PCOS-এ আক্রান্ত নারীরা মনে করেছেন যে বর্তমান নামটি বিভ্রান্তিকর। প্রায় ৮০% নারী এবং একই ধরনের সংখ্যক multidisciplinary health professionals বলেছেন যে নামটি confusing এবং পরিবর্তন করা উচিত।

এই নতুন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, genetics সম্পর্কে উন্নত ধারণা, রোগটির বিস্তৃত natural history এবং consumer advocacy organizations-এর নতুন করে আহ্বানের প্রেক্ষাপটে, এই সাধারণ রোগটির নাম পরিবর্তনের দাবি আবারও জোরালো হয়েছে। নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় অনেক চ্যালেঞ্জ থাকবে।

নাম পরিবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে দাবি ও ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তিতে একটি নজিরবিহীন, কঠোর এবং বহু-ধাপের বৈশ্বিক consensus process পরিচালনার কাঠামো তুলে ধরেছি। এই প্রক্রিয়ার জন্য funding ও governance ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ৫৬টি শীর্ষস্থানীয় academic, clinical এবং patient organization এতে অংশগ্রহণ করে।

এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের সব অঞ্চল থেকে PCOS-এ আক্রান্ত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন শাখার health professionals-সহ মোট ১৪,৩৬০ জনের মতামত সংগ্রহ করা হয়। এজন্য ধারাবাহিক ও iterative global survey, modified Delphi method, nominal group technique workshop, এবং marketing ও implementation analysis ব্যবহার করা হয়েছে।

Consensus প্রক্রিয়ায় ‘polyendocrine’, ‘metabolic’ এবং ‘ovarian’ শব্দগুলোকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করা হয়। কারণ এই শব্দগুলো রোগটির multisystem pathophysiology, অর্থাৎ শরীরের বিভিন্ন endocrine, metabolic এবং ovarian ব্যবস্থার জটিল সম্পৃক্ততাকে প্রতিফলিত করে। ফলস্বরূপ, consensus অনুযায়ী নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে—Polyendocrine Metabolic Ovarian Syndrome (PMOS)

নতুন নামটি রোগটির বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা বৃদ্ধি করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়ে—‘Cyst’ বা ‘polycystic’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ ovarian appearance-এ দেখা follicle-গুলো প্রকৃত cyst নয়।

Endocrine, metabolic এবং ovarian dysfunction—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে নামের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অতএব, Polyendocrine Metabolic Ovarian Syndrome (PMOS) নামটি PCOS-এর তুলনায় রোগটির বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণা, বহুমাত্রিক প্রকৃতি এবং multisystem involvement-কে আরও যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে।

লেখক: রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগ 

প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বিভাগ, বারডেম মা ও শিশু হাসপাতাল।