নিয়মের তোয়াক্কা করেই না একাধিক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ
ফাইল ছবি
মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমএন্ডডিসি) এর নির্দেশনা উপেক্ষা করেই শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। অপর্যাপ্ত জমি, অবকাঠামো ঘাটতি, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষক সংকট, ক্লাসরুম সল্পতা, লাইব্রেরীতে আসন ও মিউজিয়ামে সরঞ্জাম সংকট, হাসপাতালে অপর্যাপ্ত বেডসংখ্যাসহ নানা শর্ত উপেক্ষিত এসব বেসরকারি মেডিকেল কলেজে। শিক্ষা উপযোগিতার এসব ঘাটতি পূরণে সরকার বারবার তাগাদা দিলেও তা পূরণের কোনো উদ্যোগই নেননি সংশ্লিষ্ট কলেজ কর্তৃপক্ষ।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, ৫০ জন শিক্ষার্থীর আসনবিশিষ্ট বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের লক্ষ্যে মেট্রোপলিটন এলাকার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বেসরকারি মেডিকেল কলেজের নামে অন্যূন ২ একর এবং অন্য এলাকার ক্ষেত্রে ৪ একর জমি থাকতে হবে। সেই জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কলেজের একাডেমিক ভবনে এক লাখ বর্গফুট এবং হাসপাতাল ভবনের জন্য এক লাখ বর্গফুট ফ্লোর স্পেস থাকতে হবে।
বেসরকারি ডেন্টাল কলেজের জন্য মেট্রোপলিটন এলাকায় দেড় একর ও অন্য এলাকায় চার একর নিজস্ব জমি থাকতে হবে। ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের ফ্লোর স্পেস এক লাখ বর্গফুট হতে হবে।
এছাড়া বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত হবে ১:১০। শিক্ষকদের নিয়োগ, যোগ্যতা, মেয়াদ ও অন্যান্য শর্ত নির্ধারিত হবে বিএমএন্ডডিসি এর বিধিবিধান অনুযায়ী। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিতে হবে সার্বক্ষণিক।
১৯৮৬ সালে দেশে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ নামে বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু সে সময় তেমন কোন বিধিবদ্ধ আইন না থাকায় শুধু নীতিমালার ভিত্তিতেই পরিচালিত হতো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ গুলো। বর্তমানে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৭০ টি। কিন্তু এসব কলেজ পরিচালনার জন্য বেশ কিছু নিয়মনীতি প্রনয়ণ করা হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তা উপক্ষো করে খেয়াল-খুশি মতো পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর বলেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের যে নীতিমালা আছে, তা যথেষ্ট নয়। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের জন্য কোন আইন নেই। সুতরাং নীতিমালা কখনই আইনের মতো শক্তিশালী নয়। মেডিকেল কলেজগুলো বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদিত হতে হয়। তবে নিয়ম না মানলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু করার থাকে না। তাই সংসদে পাস হওয়া আইন ছাড়া বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিএমএন্ডডিসি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শন ও ডিন্স কমিটির প্রতিবেদনে কয়েকটি বেসকারি মেডিকেল কলেজের নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ। এটি ২০০৫ সালে ঢাকার আশুলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি নীতিমালা অনুসরণ না করেই চলছে তাদের কার্যক্রম। মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ফ্লোর স্পেস ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই এবং কোনো কোনো বিভাগের নিজস্ব শিক্ষক নেই। শিক্ষার্থীদের নিজস্ব হোস্টেল ঘাটতি, ক্লাসরুম সংকট, লেকচার গ্যালারি ঘাটতি রয়েছে। ভাড়া করা শিক্ষক দিয়ে নেওয়া হয় পরীক্ষা। শিক্ষক সংকটের কারনে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম। এছাড়া হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রয়োজনীয় রোগী না থাকায় চিকিৎসা শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে বলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ আইন, ২০১২ এবং ‘বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালা ২০১১ (সংশোধিত)’ অনুসারে কলেজের কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়ায় অনুমোদন বাতিল করে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর।
শ্যামলীতে অবস্থিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ। ২০১১ সালেসাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক এই মেডিকেল কলেজের অনুমোদন প্রদান করেন। এই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিজস্ব কোনো জমি নেই। কলেজ ও হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ভাড়া বাড়িতে। কলেজ ও হাসপাতালের জন্য ফ্লোর স্পেস ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। শিক্ষার্থীদের নিজস্ব হোস্টেল ঘাটতি, ক্লাসরুম সংকট, লেকচার গ্যালারি ঘাটতি রয়েছে। ছাত্রদের জন্য কোনো হোস্টেল নেই। কলেজ ও হাসপাতাল নিজস্ব জমিতে থাকবে এমন শর্তে কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ শর্ত পূরণ না করেই চলছে এই মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম।
গাজীপুর সিটি মেডিকেল কলেজ। এই মেডিকেল কলেজের ভবনটি ভাড়া করা আর হাসপাতাল ভবনের পাঁচটি ফ্লোরের মালিক বদরুদ্দোজা নামের এক ব্যক্তি। মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল অনুমোদনের প্রথম এবং অন্যতম শর্ত হলো নিজস্ব জমি ও ভবন থাকা। কিন্তু প্রথম ও প্রধান শর্ত ভঙ্গ করেই চলছে এই কলেজের কার্যক্রম। ভাড়া করা ভবনটি পোশাক কারখানার জন্য তৈরি করা হয়েছিল বলে স্থানীয়া জানান।
ভবনটির প্রতি ফ্লোরের সরু বারান্দার দুপাশে ছোট ছোট ঘরে ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিতম হয়। এছাড়া কলেজ থেকে হাসপাতাল বেশ দূরে। হাসপাতালেও পর্যাপ্ত শয্যা নেই। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কলেজটি ক্যাম্পাস বদলিয়েছে অন্তত তিনবার। নিজস্ব জমি নেই। শিক্ষার্থী অনুপাতে হাসপাতালে বেড ঘাটতি, বেড অকুপেন্সি ঘাটতিসহ প্রায় সব বিভাগে শিক্ষক সংকট, ল্যাব, শ্রেণিকক্ষের সরঞ্জাম, লাইব্রেরির আসন এবং সার্ভিস রুলের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া মেডিকেল কলেজে কোন অর্গানোগ্রাম নেই বলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রভাবশালীদের ক্ষমতা ব্যবহার করে কোন নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত বেসরকারি কেয়ার মেডিকেল কলেজ। কলেজটির নামে নির্ধারিত পরিমাণ জমি নেই। এমনকি কলেজের নিজস্ব হাসপাতালও নেই। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ও বেড অকুপেন্সি ঘাটতি রয়েছে কলেজটিতে। কলেজ কর্তৃপক্ষ কলেজ পরিচালনার ন্যূনতম শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে এই মেডিকেল কলেজের একাডেমিক অনুমোদন স্থগিত করা হয়।
শর্ত না মানা আরেকটি বেসরকারি মেডিকেল প্রতিষ্ঠান রংপুর নর্দান মেডিকেল কলেজ। কলেজ ও হাসপাতালে প্রচুর পরিমান ফ্লোরস্পেস সংকট রয়েছে। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষক সংকট, ক্লাসরুম সংকট, লাইব্রেরিতে অপর্যাপ্ত আসন সংখ্যা ও বই সংকটসহ মিউজিয়ামে সরঞ্জাম ঘাটতিসহ নানা নিয়মের ব্যত্যয় রয়েছে এই চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণও পেয়েছে পরিদর্শক দল। এসব শর্ত উপেক্ষা করে চলছে নর্দান মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না নিয়ে এবং বিএমএন্ডডিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শন ও ডিন্স কমিটির নীতিমালা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করানো মেডিকেল কলেজগুলোর মধ্যে রয়েছে, ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ, সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ, মার্কস মেডিকেল কলেজ, এনাম মেডিকেল কলেজ, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন মেডিকেল কলেজ, কুমুদিনী মেডিকেল কলেজ, রংপুর নর্দান মেডিকেল কলেজ ও হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করায় এসব মেডিকেল কলেজকে জরিমানাও করা হয়েছে।
এবিষয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) সভাপতি এমএ মুবিন খান বলেন, হাতে গোনা দুই একটি বাদে বাকি সব মেডিকেল কলেজই নিয়ম মেনে চলছে। আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের ভালো চিকিৎসক তৈরি করতে। মেডিকেল শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনে আমরা বদ্ধপরিকর। তবে যেসব মেডিকেল কলেজে নিয়মনীতির ঘাটতি রয়েছে, তারা তা পূরণের চেষ্টা করবে বলে আমি আশাবাদী।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়, বিএমডিসি ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে কিছু সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো বিভিন্ন অনিয়ম করছে। এই তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য একটি গাইডলাইন প্রণয়নের কাজ চলছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী আমরা বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগে একাধিক কলেজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে মানসম্পন্ন চিকিৎসক তৈরির জন্য প্রয়োজনে আমার আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।