বিদেশিদের জন্য জাপানের নতুন পদক্ষেপ, কঠোর হলো নিয়ম
ফাইল ছবি।
বিদেশিদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা স্থায়ী আবাসিক মর্যাদা পেতে নিয়ম আরও কঠোর করেছে জাপান।বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর করা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকারের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন নিয়ম ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। এর আওতায় জাপানে স্থায়ীভাবে থাকতে আগ্রহী বিদেশিদের প্রমাণ করতে হবে যে তাদের বার্ষিক আয় দেশের গড় আয়ের চেয়ে বেশি। পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কথাবার্তা চালানোর মতো জাপানি ভাষাজ্ঞানও থাকতে হবে।
স্থায়ী বসবাসের আবেদনের ফিও বৃহস্পতিবার থেকে ২০ গুণ বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে আবেদন করতে ১০ হাজার ইয়েন লাগত, এখন দিতে হবে ২ লাখ ইয়েন, যা প্রায় ১ হাজার ২৭৫ মার্কিন ডলারের সমান।
ফি বাড়ানোর আগে আবেদন শেষ করতে বৃহস্পতিবার টোকিওর কেন্দ্রীয় একটি অভিবাসন দপ্তরে শত শত মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইউজি চোনোও তাদের একজন। তিনি বলেন, অতিরিক্ত বিদেশি গ্রহণ করলে জাপানের নিজস্ব সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তিনি বুঝতে পারেন। তবে একই সঙ্গে জাপানের কম জন্মহার ও বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে দেশটির বিদেশিদেরও প্রয়োজন।
২২ বছর বয়সী চোনো সাবলীল জাপানি ভাষায় বলেন, কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য তিনি পাঁচ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন।
এর আগে স্থায়ী বসবাসের ক্ষেত্রে আয়, পেনশন বা ভাষাজ্ঞানের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নির্ধারণ করা ছিল না।
জাপানে জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে এবং বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের ঘাটতিও রয়েছে। এর মধ্যেই অভিবাসন নিয়ে বিরোধিতা বাড়ছে। ফলে বিদেশিদের জন্য নিয়ম আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে তাকাইচি সরকার।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে তাকাইচি বলেন, জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের কিছু নাগরিকের মধ্যে উদ্বেগ ও বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। বিদেশিদের সঙ্গে ‘সুশৃঙ্খল সহাবস্থান’ নিশ্চিত করতে তিনি নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলেও জানান।
আন্তর্জাতিক কর্মীদের জাপানে আকৃষ্ট করার বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বিদেশিদের নিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা দাবিও প্রচারিত হচ্ছে। এর মধ্যে বিদেশিরা জাপানের কল্যাণ ভাতার বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছে এবং তাঁদের কারণে দেশটির রাস্তাঘাট অনিরাপদ হয়ে উঠছে—এমন দাবিও রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞ ও অনেক ব্যবসায়ী নেতা মনে করেন, অর্থনীতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ ধরে রাখতে জাপানকে আরও বেশি বিদেশি কর্মী গ্রহণ করতে হবে।
জাপানের ব্যবসাভিত্তিক দৈনিক ‘নিক্কেই’ সম্প্রতি এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, বিদেশিদের শুধু অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদে জাপানে বসবাসের সুযোগ দেওয়া উচিত। এ জন্য জাপানি ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং বিদেশিদের সঙ্গে আচরণ উন্নত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিবাসন নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক বিতর্ক
গত বছরের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে বিদেশি ও অভিবাসন একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। ওই নির্বাচনে ‘জাপানিজ ফার্স্ট’ বা ‘জাপান আগে’ সানসেইতো দলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। দলটি অভিবাসনকে ‘নীরব আগ্রাসন’ হিসেবে বর্ণনা করে।
এর আগে গত বছর ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিও ব্যবসা পরিচালনার ভিসার নিয়ম কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছিল। নতুন শর্ত পূরণ করতে না পারলে বিদেশি উদ্যোক্তাদের জাপান ছাড়তে হতে পারে।
অনেক বিদেশি স্থায়ী বসবাসের অনুমতি চান দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, চাকরির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা এবং জাপানি সমাজে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য। স্থায়ী আবাসিক মর্যাদা না থাকলে বাড়ি কেনার জন্য ঋণ বা মর্টগেজ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হয়।
তবে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাউকে জাপান থেকে বের করে দেওয়া হবে না। এর ফলে মূলত কিছু বিদেশি স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে না-ও পারেন।
নতুন নিয়মে আবেদনকারীদের জাপানের সামাজিক নিয়মকানুন সম্পর্কে ‘বোঝাপড়া’ রয়েছে তা দেখাতে হবে। পাশাপাশি এমন পেনশন সুবিধার যোগ্যতাও দেখাতে হবে, যা ৩০ বছর ধরে পেনশন বিমার চাঁদা দেওয়া একজন ব্যক্তির সমতুল্য।
জাপানে এক দশক ধরে বসবাস করা চোনো বলেন, অভিবাসন নিয়ে বিতর্কের দুই দিকই তিনি বোঝেন। তবে দেশের ভবিষ্যৎ ধরে রাখতে তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বাড়ানোর জোরালো উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। এখন সেই গতি কিছুটা থেমে গেছে এবং হয়তো তা আর আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরবে না।