ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলন, একদিনেই গ্রেফতার ২ হাজার

ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলন, একদিনেই গ্রেফতার ২ হাজার

ছবিঃ সংগৃহীত।

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন তুমুল সংঘাত আর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।দেশজুড়ে ধর্মঘট ও প্রতিবাদ চলাকালে বিক্ষোভকারীদের সাথে দাঙ্গা পুলিশের তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। আর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরুদ্ধ করে সড়ক অবরোধ ও ব্যারিকেড গড়ে তোলে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মোট ১ হাজার ৯৪৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগের দিনও ৬২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছি। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ এই অবস্থাকে অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতা বলে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানান। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের হামলায় অন্তত ৩০৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।

উত্তপ্ত পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এডুয়ার্ড জেফ্রে জানিয়েছেন, শুক্রবার ফ্রান্সজুড়ে ৪০০টিরও বেশি স্কুল বন্ধ থাকবে। তিনি অভিযোগ করেন যে, শিক্ষার্থীদের এই স্বাভাবিক আন্দোলনকে সহিংস গোষ্ঠীগুলো পুঁজি করেছে।

এদিকে পুলিশের অনভিপ্রেত কিছু আচরণের তদন্ত শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনায় ফ্রান্সের পুলিশ ওয়াচডগ (আইজিপিএন) তিনটি পৃথক তদন্ত শুরু করেছে।

রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনালের (আরএফআই) তথ্য অনুযায়ী, টুর্স শহরে এক তরুণ পুলিশের ছোড়া মারণাস্ত্র নয় এমন অস্ত্রের আঘাতে মাথায় গুরুতর জখম হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কৌঁসুলিরা। তবে সামগ্রিকভাবে পুলিশের গৃহীত পদক্ষেপকে আনুপাতিক ও পরিস্থিতির নিরিখে যৌক্তিক বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বিক্ষোভের কারণে দেশটির বিভিন্ন শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মার্শেইতে একটি উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে জ্বলে ওঠা আগুন নেভাতে গেলে বিক্ষোভকারীরা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ওপর হামলা চালায়, যানবাহন লুটপাট করে এবং একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মী আহত হন।

এ ছাড়া লা ফ্লোরিডা স্কুলের কাছে একটি সিটি বাস পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং আরও কয়েকটি বাসে হামলা চালানো হলে কর্তৃপক্ষ পুরো মার্শেই শহরজুড়ে গণপরিবহন সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৃহস্পতিবার রাতে ফরাসি সরকার একটি জরুরি সংকটকালীন বৈঠক করে। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করে, এই নৈরাজ্য ও সহিংসতা বামপন্থী দল ‘লা ফ্রান্স ইনসোমিস’ (এলএফআই) এবং তাদের চরমপন্থী প্রক্সি সংগঠনগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংগঠিত করেছে।

তবে সরকারের এই অভিযোগ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এলএফআই। দলের মুখপাত্র ম্যানুয়েল বোম্পার্ড এএফপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সরকারের উচিত হবে না কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বে মেতে ওঠা কিংবা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিশুর মতো বিবেচনা করা।

এই ক্ষোভ কোনো চক্রান্তের ফল নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চরম অগ্রহণযোগ্য ও অনুন্নত পরিবেশের বিরুদ্ধেই এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। এছাড়া আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এলএফআই-এর প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলেনশঁ শিক্ষার্থীদের কেবল অহিংস পথ অবলম্বন করে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

ফরাসি শিক্ষার্থীরা শিক্ষাখাতে সরকারি বাজেট বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ক্লাসের সময়সূচি সংক্ষেপণ এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে। তবে স্কুল প্রশাসনিক ইউনিয়ন এসএনপিডিইএন-উনসা-এর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ক্রিস্টেল কফম্যান জানিয়েছেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানোর মতো পর্যাপ্ত সম্পদ বর্তমানে তাদের হাতে নেই। বিএফএম টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আন্দোলনে বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষকও আহত হয়েছেন, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

দেশজুড়ে এই আন্দোলনের কারণে বহু অবকাঠামোর ক্ষতি সাধিত হয়েছে। প্যারিসের লিসি ডিডেরোট স্কুলের সামনে আবর্জনার বিন ও স্কুটারে আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় ভবনের সামনের অংশ পুড়ে কালো হয়ে গেছে। অন্যদিকে নান্তেসের লিসি নেলসন-ম্যান্ডেলা স্কুলেও দুর্বৃত্তদের আগুনে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

এমন এক সময়ে এই নজিরবিহীন অসন্তোষ দেখা দিল, যখন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তা সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশের মাত্র ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ মানুষের তার ওপর আস্থা রয়েছে।