জিহ্বার অপব্যবহার যেভাবে জাহান্নামের কারণ

জিহ্বার অপব্যবহার যেভাবে জাহান্নামের কারণ

ফাইল ছবি

মানবদেহের ক্ষুদ্র অঙ্গগুলোর একটি জিহ্বা, অথচ এর প্রভাব সবচেয়ে বিস্তৃত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি শক্তিশালী অস্ত্রের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।আল্লাহ প্রদত্ত এই নিয়ামত সঠিক ব্যবহারে জান্নাতের সোপান হয়, আবার অসতর্ক ব্যবহারে হয় জাহান্নামের কারণ। তাই ইসলাম জবানের হেফাজতকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করেছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে, সেই প্রকৃত মুসলিম। আর যাকে মানুষ তাদের জান-মালের জন্য নিরাপদ মনে করে, সে-ই প্রকৃত মুমিন।

(তিরমিজি, হাদিস : ২৬২৭)

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বেশির ভাগ মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির ব্যবহার সম্পর্কে উদাসীন। তারা এর অপব্যবহার এত বেশি করে যে যদি তাদের জিহ্বার কথাগুলোর হিসাব ও পরিমাণ তাদের দেখানো যেত, তাহলে তারা হয়তো বাকি জীবন আর মুখ খোলারই সাহস করত না। কারণ মানুষ যা কিছু উচ্চারণ করে, সবকিছু লেখা হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে, যে (লেখার জন্য) সদা প্রস্তুত।

’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ১৮)

অর্থাৎ আমাদের প্রতিটি শব্দ সংরক্ষিত হচ্ছে। কোনো কথাই হারিয়ে যায় না। একসময় মানুষের গোটা জীবনের সব কথা ও কাজ সংরক্ষিত থাকা অবিশ্বাসীর কাছে অসম্ভব মনে হলেও এই বিষয়টি বর্তমান যুগে আর অবিশ্বাস্য মনে হয় না। কারণ প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের কথাবার্তা, চলাফেরা, গতিবিধি সব রেকর্ড রাখা সম্ভব। বর্তমান যুগেও শুধু কথাবার্তার কারণে বহু মানুষ বিপদে পড়ার নজির রয়েছে।

এমনকি একটি কথার জেরে রাজত্ব হারানোর মতো ঘটনাও পৃথিবীতে ঘটেছে। তাই তো জিহ্বার অপব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক করে হাদিস শরিফে এসেছে, সাহল ইবনু সা‘দ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহ্বা) এবং দুই রানের মাঝখানের বস্তু (লজ্জাস্থান)-এর জামানত আমাকে দেবে, আমি তার জান্নাতের জিম্মাদার।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৪)

দুনিয়ার বেশির ভাগ পাপ এই দুই অঙ্গ ঘিরেই ঘটে, তাই এ দুটির হেফাজতেই জান্নাতের জামানত। আজ জবানের পরিসর বেড়েছে বহুগুণ। একসময় একটি কথা কয়েকজন শ্রোতার মধ্যেই সীমিত থাকত। এখন একটি পোস্ট, একটি ভিডিও বা একটি গুজব মুহূর্তে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

অর্থনীতিতে এর প্রভাব স্পষ্ট। ব্যাংক বা কম্পানির বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন গুজব মানুষকে আতঙ্কিত করে, আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে, শেয়ারবাজার ধসে যায়। অথচ ইসলাম যাচাই ছাড়া কথা ছড়ানোকেই নিষিদ্ধ করেছে। রাজনীতিতেও মিথ্যা প্রচারণা ও চরিত্রহননের সংস্কৃতি সমাজে বিভেদ, ঘৃণা ও সহিংসতার বীজ বোনে।

তাই তো ইসলাম গিবত, অপবাদ ও মিথ্যা সাক্ষ্যকে কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করেছে। শুধু ব্যক্তিগত পাপ হিসেবে নয়, সামাজিক শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য ক্ষতিকর হিসেবেও বিবেচনা করেছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও বলে, ক্রমাগত পরনিন্দা ও কটূক্তি সম্পর্ক নষ্ট করে, পারস্পরিক আস্থা ভাঙে এবং মানসিক চাপ বাড়ায়। যে পরিবেশে সবাই সবার পেছনে কথা বলে, সেখানে কেউ নিরাপদ বোধ করে না।

ইসলাম চৌদ্দ শ বছর আগেই এই সমাজবিধ্বংসী প্রবণতার চিকিৎসা দিয়েছে। তা হলো, জিহ্বার ব্যবহারে সতর্ক হওয়া ও মহান আল্লাহকে ভয় করা। আবু বকর (রা.) নিজের জিহ্বা ধরে বলতেন, এটিই তাঁকে বিপদে ফেলেছে। ইবনু মাসউদ (রা.) বলতেন, জিহ্বার চেয়ে দীর্ঘ কারাবাসের যোগ্য আর কিছু নেই।

তাই মুমিনের উচিত, কোনো কথা বলার আগে ভাবা, এতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন কি না। কোনো খবর শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা। রাগের মুহূর্তে চুপ থাকা। কারণ নীরবতা অনেক ভুল থেকে বাঁচায়। নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য অহেতুক কারো সঙ্গে কটুকথা না বলা। গিবত, চোগলখুরি ও উপহাসের আসর থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা। জিহ্বাকে জিকির, সত্য ভাষণ ও উত্তম কথায় অভ্যস্ত রাখা।

কারণ জিহ্বা যেমন ধ্বংসের হাতিয়ার হতে পারে, তেমনি কল্যাণ লাভের মাধ্যমও হতে পারে। আল্লাহ আমাদের জবানকে মিথ্যা, গিবত ও অশ্লীলতা থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের কথাকে হিদায়াত ও নূরের উপলক্ষ বানিয়ে দিন। আমিন।