পেট ভরে খাওয়া নিয়ে ইসলামের শিক্ষা কী
ফাইল ছবি
খাবার মানুষের স্বাভাবিক চাহিদার একটি অংশ। বয়স, শারীরিক অবস্থা, কাজের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষের খাবারের পরিমাণও ভিন্ন হতে পারে। তাই কেউ তুলনামূলক বেশি খেলেই তাকে গুনাহগার বা শয়তানের প্রভাবে আক্রান্ত বলা ঠিক নয়। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো- খাবারের ক্ষেত্রে সংযমী হওয়া, অপচয় থেকে বেঁচে থাকা এবং প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে এমনভাবে না খাওয়া, যাতে শরীরের ক্ষতি হয়।
কোরআনে খাবার গ্রহণের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ: ৩১)
এই আয়াতে খাবার গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে অপচয় থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক খাদ্যচাহিদাকে স্বীকার করে, তবে সীমালঙ্ঘন ও অপচয়কে নিরুৎসাহিত করে।
পরিমিত আহারের শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ (স.) খাবারের পরিমাণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। মিকদাম ইবনু মাদিকারিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মানুষ তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। আদমসন্তানের জন্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট, যা তার পিঠ সোজা রাখে। আর যদি এর চেয়ে বেশি খেতেই হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।’ (জামে তিরমিজি: ২৩৮৩)
হাদিসটিতে পরিমিত আহারের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। পেট পুরোপুরি ভরে ফেলার পরিবর্তে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার গ্রহণের শিক্ষা এতে পাওয়া যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া বা পেট ভরে খাওয়া হারাম। খাবারের পরিমাণ এমন পর্যায়ে পৌঁছালে সমস্যা তৈরি হয়, যখন তা শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়। তাই অতিভোজনের কারণে শারীরিক কষ্ট বা ক্ষতি হলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত।
‘পেট ভরে খাওয়া’ কি বিদআত
পেট ভরে খাওয়াকে অনেকে ‘ইসলামের প্রথম বিদআত’ বলে অভিহিত করে থাকেন। নির্ভরযোগ্য বর্ণনা বা সহিহ হাদিসে এমন কথা বলা হয়েছে বলে দাবি করা ঠিক নয়। বিদআত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পরিভাষা। তাই কোনো কাজকে বিদআত বলার আগে তার নির্ভরযোগ্য দলিল থাকা জরুরি। তবে হ্যাঁ, অতিরিক্ত ও ক্ষতিকর ভোজনের ব্যাপারে হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে।
একইভাবে, কেউ বেশি খাবার গ্রহণ করলেই তাকে ‘শয়তানের প্রভাবে’ আক্রান্ত বলা যায় না। এরও নির্ভরযোগ্য সাধারণ দলিল নেই। মানুষের খাবারের প্রয়োজন ব্যক্তি ও শারীরিক অবস্থাভেদে ভিন্ন হয়।
অতিভোজন সম্পর্কে সতর্কতা
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মুমিন এক পেটে খায়, আর কাফির সাত পেটে খায়।’ (সহিহ বুখারি: ৫৩৯৩)
আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, হাদিসটির মূল শিক্ষা হলো মুমিনের সংযমী জীবনযাপন। এখানে খাবারের নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। একজন মুমিনের জীবনে ভোগ-বিলাসের পরিবর্তে সংযম ও পরিমিতির গুণ থাকা উচিত, হাদিসটি সেই শিক্ষাই দেয়।
অতিরিক্ত ভোজনের পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে। সালমান (রা.)-কে খাবার খেতে পীড়াপীড়ি করা হলে তিনি বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘দুনিয়ায় যেসব লোক ভূরিভোজ করে, তারাই কেয়ামতের দিন অধিক ক্ষুধার্ত হবে।’ (সুনান ইবনে মাজাহ: ৩৩৫১)
এই বর্ণনায় দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে অতিরিক্ত আসক্ত না হয়ে সংযমী জীবনযাপনে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
রোজা ও ইফতারেও সংযম
ইসলামের এই শিক্ষা রোজার সময় আরও গুরুত্বপূর্ণ। রোজার উদ্দেশ্য মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাকওয়া অর্জন। অথচ অনেক সময় ইফতার ও সাহরিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়।
সারা দিন সংযমের পর ইফতারের সময় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করলে রোজার মাধ্যমে অর্জিত আত্মসংযমের শিক্ষাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই রোজার সময়ও খাবারের ক্ষেত্রে পরিমিতি ও অপচয় থেকে বেঁচে থাকা ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
খাবারের অপচয় নয়, অন্যের কথাও ভাবতে হবে
খাবারের ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা ব্যক্তিগত সংযমের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনের কথাও মনে করিয়ে দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর আত্মীয়কে তার হক দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৬-২৭)
তাই দাওয়াত, বিয়ে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার নিয়ে পরে ফেলে দেওয়া ইসলামের অপচয়বিরোধী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সামর্থ্য থাকলে অতিরিক্ত খাবার নষ্ট না করে অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও খাবারের নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতার একটি প্রকাশ হতে পারে।
তাহলে কতটুকু খাব
ইসলাম সবার জন্য একই পরিমাণ খাবার নির্ধারণ করে দেয়নি। একজন শ্রমজীবী মানুষের খাবারের প্রয়োজন একজন কম পরিশ্রমী মানুষের মতো নয়। একইভাবে শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ও সুস্থ মানুষের প্রয়োজনও ভিন্ন।
তাই মূল বিষয় খাবারের নির্দিষ্ট পরিমাণ নয়, খাবারের ক্ষেত্রে সংযম। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী খাওয়া, প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে নিজের ক্ষতি না করা এবং খাবার অপচয় না করাই ইসলামের খাদ্যসংক্রান্ত শিক্ষার মূল কথা।
সুস্থ থাকার প্রয়োজনের পাশাপাশি একজন মুসলিম রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সংযমী জীবনযাপনের অনুসরণের নিয়ত করতে পারেন। এতে খাবারের ক্ষেত্রে আত্মসংযমের একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য তৈরি হয়।
ইসলাম খাবার বর্জনের শিক্ষা দেয় না। শিক্ষা দেয়- আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত গ্রহণ করতে হবে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে, প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম না করে এবং অপচয় থেকে বেঁচে।