স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা কিনতে আগ্রহী
ফাইল ছবি
বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের রিটেইল বা ভোক্তা ব্যাংকিং ব্যবসা কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের ছয়টি বেসরকারি ব্যাংক। ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের পর নতুন করে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে পূবালী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক ও ডাচ-বাংলা ব্যাংক।
আগ্রহী ব্যাংকগুলোর কয়েকটি ইতোমধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে ব্যবসাসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের জন্য অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি (এনডিএ) করেছে। অন্য ব্যাংকগুলোও এনডিএ সই করতে আগ্রহ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসার আওতায় থাকা আমানতই মূলত দেশীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রহের বড় কারণ।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, এ ব্যবসার আমানতের বড় অংশে ব্যাংকটিকে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ হারে সুদ দিতে হয়। বিপরীতে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় অংশের সুদহার ৬ থেকে ৯ শতাংশ। ফলে তুলনামূলক কম খরচের আমানত পাওয়ার সুযোগটিকে আকর্ষণীয় মনে করছেন আগ্রহী ব্যাংকগুলো।
তবে, ব্যবসাটি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত নিয়ে আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড রিটেইল ব্যবসার সম্পদ ও দায়ের পাশাপাশি এ খাতে কর্মরত প্রায় দেড় হাজার কর্মীকেও অধিগ্রহণের শর্ত দিয়েছে। ফলে ব্যবসাটি কিনলে অতিরিক্ত জনবলের ব্যয় কতটা হবে এবং পুরো অধিগ্রহণ শেষ পর্যন্ত লাভজনক হবে কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করছে কয়েকটি ব্যাংক।
পূবালী ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণের বিষয়ে তারা আলোচনা করেছেন। তবে, ব্যবসার সঙ্গে কর্মীদের বিষয়েও নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। এতসংখ্যক কর্মী নেওয়া সম্ভব কি না এবং অধিগ্রহণটি ব্যাংকের জন্য কতটা লাভজনক হবে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশে রিটেইল ব্যবসার আকার বড়। ব্যাংকটির মোট প্রায় ১ হাজার ৯০০ কর্মীর মধ্যে প্রায় দেড় হাজারই রিটেইল ব্যাংকিংয়ে কাজ করেন। এ ব্যবসার আওতায় রয়েছে ব্যাংকটির ১৮টি শাখা, একটি ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো ও ইসলামি ব্যাংকিং সেবা। এ ছাড়া, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, স্মার্ট ও চলতি হিসাব, স্থায়ী ও বৈদেশিক মুদ্রার আমানত, প্রিমিয়াম ও রিওয়ার্ডভিত্তিক ক্রেডিট কার্ড এবং বিভিন্ন ধরনের ঋণসেবা রয়েছে।
রিটেইল ব্যবসার ঋণপণ্যের মধ্যে ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়ির ঋণ এবং ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি সংস্কারের জন্য গৃহঋণ রয়েছে। সব মিলিয়ে এ ব্যবসার আওতায় আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে, অধিগ্রহণ করলেও ক্রেতা ব্যাংকগুলো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের নাম ব্যবহার করতে পারবে না। এ কারণে বর্তমানে কম সুদে পাওয়া আমানতের কতটা অংশ অধিগ্রহণের পর ধরে রাখা সম্ভব হবে, সেটিও আগ্রহী ব্যাংকগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে ব্যবসার সম্পদ ও দায়ের পাশাপাশি ব্র্যান্ড পরিবর্তনের পর গ্রাহক ও আমানত ধরে রাখার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশের রিটেইল ব্যবসা বিক্রির প্রক্রিয়াটি ব্যাংটির দুবাই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একজন শীর্ষ কর্মকর্তা তদারক করছেন। একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ব্যাংকটির এশিয়ার কয়েকটি দেশের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। আগ্রহী ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার সঙ্গেই মূলত যোগাযোগ করছেন।
তবে, চূড়ান্তভাবে কোন ব্যাংক এ ব্যবসা পাবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। ব্যবসাটি বিক্রির আগে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড আনুষ্ঠানিক নিলাম আয়োজন করবে। আগ্রহী ব্যাংকগুলো ওই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার পরই ক্রেতা নির্ধারণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশে রিটেইল ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা জানায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এরপরই কয়েকটি দেশীয় ব্যাংক ব্যবসাটির অংশ অধিগ্রহণে আলোচনা শুরু করে।
বাংলাদেশে বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর ভোক্তা ব্যাংকিং ব্যবসা পুনর্বিন্যাসের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত বছরের মাঝামাঝি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেয় এইচএসবিসি। তারও আগে, ২০০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক।
বাংলাদেশের বাইরে আরো কয়েকটি দেশেও স্থানীয় ও ভোক্তা ব্যাংকিং কার্যক্রম পুনর্গঠন করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়ে থেকে স্থানীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংকটি।
তানজানিয়া ও আইভরি কোস্টে কনজ্যুমার, প্রাইভেট ও বিজনেস ব্যাংকিং থেকে সরে গেলেও সেখানে করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং চালু রাখে। পরে শ্রীলঙ্কায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি করে দেয়।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী বলেন, “স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ ধারাবাহিকভাবে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে। এর ভিত্তিতে যেসব ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে অনন্য সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে সম্পদ কেন্দ্রীয়করণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”