দুর্লভ খনিজের ক্ষেত্রে চীন নির্ভরতা কমাতে পারবে কি যুক্তরাষ্ট্র?

দুর্লভ খনিজের ক্ষেত্রে চীন নির্ভরতা কমাতে পারবে কি যুক্তরাষ্ট্র?

ছবিঃ সংগৃহীত।

বহু দশক ধরে বিশ্বজুড়ে দুর্লভ খনিজ (রেয়ার আর্থ) পরিশোধনের বাজারে চীনের যে একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে, তা ভাঙতে এবার এক অভিনব পথ বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।চীনা প্রযুক্তি নকল করার পরিবর্তে নিজস্ব উদ্ভাবনী ও দেশীয় পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী শোধন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমেরিকান ব্যক্তিগত খনিজ শোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল আর্থিক অর্থায়ন করছে বাইডেন-ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নির্ধারকরা।

সম্প্রতি লন্ডনে অনুষ্ঠিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমস মেটালস অ্যান্ড মাইনিং সামিটে এশিয়া টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জির (ডিওই) অধীনস্থ ‘অফিস অব ক্রিটিক্যাল মিনারেলস অ্যান্ড এনার্জি ইনোভেশন’-এর সহকারী সচিব অড্রে রবার্টসন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন কৌশলের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, মার্কিন শোধনকারীরা তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী দক্ষতার ওপর নির্ভর করেই অতি প্রয়োজনীয় এই কৌশলগত খনিজ উৎপাদনে দেশকে স্বাবলম্বী করে তুলবে।

গত দুই দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্জন করলেও বড় আকারের কারখানা নির্মাণ ও সার্বিক উৎপাদন ক্ষমতার প্রয়োগ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে বলে স্বীকার করেন রবার্টসন। তবে অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ওয়াশিংটন এখন এমন এক কৌশল গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে উদ্ভাবনগুলো যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হবে এবং দেশেই স্থায়ীভাবে বাস্তবায়িত হবে।

তিনি মার্কিন জ্বালানি খাতের ঐতিহাসিক মোড় ঘোরার উদাহরণ টেনে বলেন, ঠিক ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিকারক দেশ। কিন্তু ওপেক বা তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করে তারা দেশীয় উদ্ভাবনের দিকে নজর দিয়েছিল।

যার ফলে আজ তারা বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ঠিক একই অদম্য মানসিকতা ও ড্রাইভ নিয়ে তারা দুর্লভ খনিজ ও এর প্রক্রিয়াজাতকরণের সমস্যা সমাধানের জন্য মাঠে নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই মরিয়া চেষ্টার পেছনে রয়েছে বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরেই চীন দুর্লভ খনিজ খাতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ কারিগরি জনবল বিদেশে পাঠাতে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চুম্বক তৈরির প্রযুক্তি রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পর, এ বছরের জুনে এমপি মেটেরিয়ালস ও ইউএসএ রেয়ার আর্থের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কাছে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয় চীন। এমনকি গত মাসে অভিজ্ঞ খনিজ বিশেষজ্ঞদের বিদেশযাত্রা রুখতে দেশত্যাগের আইন আরও কঠোর করেছে শি জিনপিং সরকার।

চীনা নিয়ন্ত্রণের জবাবে ওয়াশিংটনও তাদের প্রচেষ্টাকে কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে নেব্রাস্কার এল্ক ক্রিক প্রকল্পে মার্কিন পেন্টাগন ১০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়, যা ২০২৯ সালের শেষের দিকে আমেরিকার প্রথম নাইওবিয়াম খনিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট এই খনি এলাকা পরিদর্শন করেন।

এছাড়া চলতি বছরের ২ জুন খনি ও শিল্পবর্জ্যকে দুর্লভ খনিজে রূপান্তর করার দুটি প্রদর্শনী কেন্দ্র তৈরির জন্য কলোরাডো স্কুল অফ মাইনস এবং ফিনিক্স টেলিংসকে ১৩৪ মিলিয়ন ডলার প্রদান করা হয়েছে। তবে দুর্লভ খনিজ খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অভাব থাকায় কারিগরি ও মেধা সংকট দেখা দিয়েছে। এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে গত ৭ আগস্ট মার্কিন কার্যালয়টি ‘প্রোসপেক্ট’ নামে ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি উদ্যোগ চালু করেছে, যার মূল লক্ষ্য আগামী দুই বছরের মধ্যে খনি ও খনিজ বিষয়ে স্নাতকদের সংখ্যা দ্বিগুণ করা।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে চীনারা গত চার দশক ধরে ঐতিহ্যবাহী 'দ্রাবক নিষ্কাশন' বা 'সলভেন্ট এক্সট্রাকশন' পদ্ধতিকে পরিমার্জিত ও নিখুঁত করেছে। সেখানে শক্তিশালী অ্যাসিড এবং কেমিক্যাল মিশিয়ে শত শত মিক্সিং ও সেটলিং ট্যাঙ্কের মাধ্যমে একেকটি উপাদান পৃথক করা হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুটি প্রধান উদ্ভাবনী ব্যবস্থার দিকে জোর দিচ্ছে, কন্টিনিউয়াস আয়ন ক্রোমাটোগ্রাফি (সিআইসি) এবং ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল সেপারেশন।

১৯৫০-এর দশকে খরচের দোহাই দিয়ে ক্রোমাটোগ্রাফি বাদ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, তবে দুর্লভ খনিজের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক মূল্যের কারণে এখন এই খরচকে অত্যন্ত যৌক্তিক মনে করা হচ্ছে। অন্যটিতে গলিত লবণে ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে খনিজ আলাদা করা হয়। তবে শিল্পের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, চীনা পদ্ধতির পেছনে থাকা দুই দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা বাদ দিয়ে একেবারে নতুন প্রযুক্তিতে যেতে মার্কিন খামারগুলোকে বেশ উচ্চমূল্য ও চড়া খেসারত দিতে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকিনসের সিনিয়র পার্টনার মিচেল ভ্যান হোয়ে জানান, খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের যে সক্ষমতা অতীতে পশ্চিমারা চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল, বেইজিং তাকে বিগত ৪০ বছরে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে চীননির্ভরতা পুরোপুরি কাটাতে হলে পশ্চিমা বিশ্বকে অভাবনীয় গতিতে এই ব্যবধান পূরণ করতে হবে।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নানা প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তি প্রয়োগ করছে। এমপি মেটেরিয়ালস এবং নিওকর্প যেখানে প্রথাগত সলভেন্ট এক্সট্রাকশন ব্যবহার করছে, সেখানে ফিনিক্স টেলিংস ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল পদ্ধতি এবং ইউএসএ রেয়ার আর্থ ও কলোরাডো স্কুল অফ মাইনস সিআইসি প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি ফিনিক্স টেলিংস নিউইয়র্কের রচেস্টারে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে 'ফ্রিডম সেপারেশন' নামে একটি আধুনিক সুবিধা গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে বছরে ৪৪০০ টনের বেশি পরিশোধিত রেয়ার আর্থ অক্সাইড তৈরি করবে। এই প্রকল্পের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে পেন্টাগন থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের শর্তসাপেক্ষ ঋণ এবং ডিওই থেকে ৬৬ মিলিয়ন ডলারের অনুদান নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে টরন্টো-তালিকাভুক্ত আক্লারা রিসোর্সেস লুইসিয়ানার পোর অব ভিনটনে ৪৯৪ মিলিয়ন ডলার খরচে একটি কারখানা চালুর পরিকল্পনা করছে, যেখানে ব্রাজিল ও চিলি থেকে সংগৃহীত খনিজ শোধন করা হবে।

আমেরিকার খনিজ যুদ্ধ ও চীনের কৌশলগত বিধিনিষেধের কারণে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে এশিয়ার দেশ জাপান। সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইচি তাইওয়ান সংকটকে জাপানের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে উল্লেখ করার পর গত ৬ জানুয়ারি বেইজিং জাপানি সামরিক সংশ্লিষ্ট খাতে খনিজ ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে জেট ইঞ্জিন ও চিপ তৈরির যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত অতীব গুরুত্বপূর্ণ তাপ-প্রতিরোধী ধাতু 'ইট্রিয়াম'-এর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে জাপানে।

আন্তর্জাতিক বাজারে গত দুই বছরে খনিজটির দাম ১৭৯ গুণ বেড়ে কেজিতে ১১৫০ ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে চীনে এর দাম মাত্র ৯ ডলার। দ্রুততম সময়ে বিকল্প ব্যবস্থা করা না গেলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে জাপানের ইট্রিয়াম মজুত শূন্যে নেমে যেতে পারে বলে কূটনৈতিক পর্যায়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ওয়াশিংটনের নতুন এই মেগা পরিকল্পনা ও কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের সাফল্য নিয়ে মার্কিন আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান একিন গাম্প-এর সিনিয়র কাউন্সিল লরা কোনকেল অত্যন্ত আশাবাদী। তাঁর মতে, হয়তো সরকারের অনুদান পাওয়া প্রতিটি প্রকল্প শেষ পর্যন্ত সফল হবে না, তবে ঐতিহাসিক মাত্রার সরকারি মূলধন এবং প্রচুরসংখ্যক নতুন চুক্তির কারণে এই উদ্যোগের সফল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।