ক্ষমতা হারানোর মুখে নেতানিয়াহু, বিকল্প সরকার গঠনে বিরোধীদের তৎপরতা

ক্ষমতা হারানোর মুখে নেতানিয়াহু, বিকল্প সরকার গঠনে বিরোধীদের তৎপরতা

প্রতীকী ছবি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে একজোট হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির বিরোধী দলের নেতারা। নির্বাচনে কোনো পক্ষই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বিকল্প সরকার গঠনের চেষ্টা চলছে। তবে সেই সরকারে আরব আইনপ্রণেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে বিরোধী শিবিরের মধ্যেই মতভেদ রয়েছে।

গত মঙ্গলবার নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসেন বিরোধী জোটের পাঁচ দলের প্রধানেরা। তেলআবিবের উত্তরে হার্জলিয়ায় এক হোটেলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকার গঠনের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, যত দ্রুত সম্ভব সরকার গঠন এবং ইসরায়েলকে আরেকটি নির্বাচনের দিকে ঠেলে দেওয়া ঠেকানোই তাঁদের লক্ষ্য।

সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের নেতারা তাঁর প্রস্তাবিত চারটি নীতিগত শর্তের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে, সরকারে থাকা দলগুলোকে ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিন্দা জানাতে হবে। এসব শর্তের কারণে কয়েকটি আরব দলের সঙ্গে জোট গঠনের পথ কঠিন হতে পারে।

নির্বাচনের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ১২০ আসনের নেসেটে নেতানিয়াহুর শিবির পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। এর মধ্যে জয়েন্ট লিস্টের ১১টি এবং রা’আমের আটটি আসন রয়েছে।

কোনো পক্ষেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বিরোধী জোটের ডানপন্থী নেতা আভিগদর লিবারম্যান সরকারে আরব দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান আরব দলগুলোকে বাদ দেওয়াকে বর্ণবাদী অবস্থান বলে মন্তব্য করেছেন।

আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিভক্ত বিরোধীরা

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী জোটের নেতারা দ্রুত সরকার গঠনের বিষয়ে একমত হলেও আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে জোট করা নিয়ে তাঁদের অবস্থান এক নয়। নির্বাচনের আগে পরিচালিত জনমত জরিপেও দেখা গেছে, আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইহুদি ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। বিশেষ করে ডানপন্থী ভোটাররা এর বিরোধিতা করছেন।

আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ইউসেফ জাবারিন এএফপিকে বলেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধীদের রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এদিকে আরব জয়েন্ট লিস্টের চেয়ারম্যান ইউসেফ জাবারিন ও পার্লামেন্টারি গ্রুপের নেতা আহমেদ তিবি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনের ফল পর্যালোচনার পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নেতানিয়াহু, ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগানোর বিষয়েও তাঁরা একমত হয়েছেন।

ইয়ার গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া বিরোধী নেতাদের মধ্যে অন্যতম। বৈঠকে যাওয়ার আগে তিনি ইসরায়েলি-আরব নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অপরাধ দমন, সমৃদ্ধি ও সমতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

তবে আইজেনকটের জোটের ডানপন্থী নেতা আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোকে সরকারে নেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। যদিও তিনিও নতুন নির্বাচন এড়াতে চান।

নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের প্রস্তাব

এদিকে সোমবার নেতানিয়াহু একটি ‘বৃহৎ জাতীয় সরকার’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দল লিকুদ পার্টি নির্বাচনে আগের তুলনায় আসন হারালেও একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। তাই নতুন সরকারে নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

তবে বিরোধী দলের কোনো নেতা নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠনে আগ্রহ দেখাননি। ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা এই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভাজন সৃষ্টির অভিযোগ, দুর্নীতির মামলা এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার বিষয়গুলো সামনে আনছেন বিরোধীরা।

নেতানিয়াহুও আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এসব দল সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে এবং ইহুদি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করে। তবে আরব-ইসরায়েলি দলগুলোর নেতারা ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। যদিও তাঁরা হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দেননি।

রা’আম পার্টির নেতা ইসরায়েলকে ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও অন্য কয়েকজন আরব দলীয় নেতা এই সংজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে সরকার গঠনের আলোচনায় এই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকার গঠনের দায়িত্ব কে পাবেন

নির্বাচনের পর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বুধবার ও বৃহস্পতিবার নেসেটে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এরপর সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য একজন আইনপ্রণেতাকে মনোনীত করবেন।

বিরোধী জোটের নেতা ও ইয়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকট আরব আইনপ্রণেতাদের সমর্থন পেলে সরকার গঠনের জন্য সবচেয়ে বেশি সুপারিশ পেতে পারেন। বিরোধী জোটের অন্য নেতারাও তাঁকে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এদিকে ৭ অক্টোবরের হামলায় বাবা-মাকে হারানো মেরাভ স্ভিরস্কি বিরোধী নেতাদের কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। হামাস যোদ্ধাদের হাতে তাঁর বাবা-মা নিহত হন এবং তাঁর ভাইকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট না করতে আইজেনকটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

স্ভিরস্কি সাংবাদিকদের বলেন, ‘গণহত্যার সরকারের সদস্যদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা আমাদের ওপর যে পরিত্যক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তাকে বৈধতা দেবে।’

নেতানিয়াহু ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে ইসরায়েলের ক্ষমতায় রয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার চলছে। গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

নির্বাচনে কোনো পক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া এবং বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে নেতানিয়াহুকে সরানোর উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সূত্র: এএফপি