নবীজির জীবনের শেষ ৫ দিন
ছবি: সংগৃহীত
ইসলামের পূর্ণতা ও আরব ভূখণ্ডে বিজয় সম্পন্ন হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আচরণ ও বক্তব্যে এমন কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে, যা তাঁর পার্থিব জীবনের সমাপ্তি ঘনিয়ে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ইসলামি গবেষকদের ভাষায় এসব আলামতকে বলা হয় ‘তালাইউত তাওদি’ বা বিদায়ের সূচনাসমূহ। এর মধ্যে ছিল হজে বিদায় ভাষণ, ওহির সমাপ্তি এবং মৃত্যুর ঘনঘন স্মরণ।
অসুস্থতার সূচনা
একাদশ হিজরির ২৯ সফর সোমবার তিনি বাকী কবরস্থানে একটি জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। ফেরার পথে মাথাব্যথা ও জ্বরে আক্রান্ত হন। এটিই ছিল তাঁর শেষ অসুস্থতার সূচনা, যা প্রায় ১৩-১৪ দিন স্থায়ী হয়। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি টানা ১১ দিন নামাজে ইমামতি করেন, যা উম্মতের প্রতি তাঁর গভীর দায়িত্ববোধের প্রমাণ।
শেষ সপ্তাহ
অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি বারবার জানতে চাইতেন, ‘আগামীকাল আমি কোথায় থাকব?’ স্ত্রীগণ তাঁর ইঙ্গিত বুঝে তাঁকে আয়েশা (রা.)-এর ঘরে থাকার অনুমতি দেন। আলী (রা.) ও ফজল ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কাঁধে ভর করে তিনি আয়েশা (রা.)-এর ঘরে চলে যান এবং জীবনের শেষ সপ্তাহ সেখানেই কাটান। আয়েশা (রা.) তাঁকে সুরা নাস, ফালাক ও দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করতেন।
পাঁচ দিন আগে
অসুস্থতা তীব্র হলে তিনি সাত মশক পানি ঢালার অনুরোধ করেন, যেন কিছুটা সুস্থ হয়ে সাহাবিদের উপদেশ দিতে পারেন। পরে মসজিদে গিয়ে মাথা বাঁধা অবস্থায় ভাষণ দেন। সেখানে তিনি ইহুদি-খ্রিস্টানদের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন- ‘তোমরা আমার কবরকে উপাসনার স্থান বানিও না।’ তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে ঘোষণা দেন, যদি কারও প্রতি অন্যায় করে থাকেন তবে তিনি প্রতিশোধ নিতে পারেন। আনসারদের সম্পর্কে বিশেষ সুপারিশ করেন এবং আবু বকর (রা.)-এর মর্যাদা উল্লেখ করে বলেন- যদি আল্লাহ ছাড়া কাউকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বানাতেন তবে তিনি হতেন আবু বকর।
চার দিন আগে
তিনি কাগজ-কলম চান, যেন এমন একটি লিখিত দিকনির্দেশনা রেখে যান যাতে উম্মত কখনো পথভ্রষ্ট না হয়। সাহাবিদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি তাদের চলে যেতে বলেন এবং পরিবর্তে তিনটি মৌখিক উপদেশ দেন—
১. আরব উপদ্বীপ থেকে অমুসলিমদের বের করে দাও।
২. আগত প্রতিনিধিদের সম্মান করো।
৩. তৃতীয় বিষয়টি বর্ণনাকারী ভুলে যান, তবে গবেষকরা বলেন এটি ছিল নামাজ, কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা অথবা উসামাহর সেনাবাহিনী পাঠানো সম্পর্কিত।
সেদিন মাগরিব পর্যন্ত তিনি নামাজে অংশ নেন। তবে এশায় দুর্বল হয়ে পড়ায় আবু বকর (রা.)-কে ইমামতি করতে নির্দেশ দেন। এর পর থেকে আবু বকর (রা.) নবীজির জীবদ্দশায় মোট ১৭ ওয়াক্ত নামাজে ইমামতি করেন।
তিন দিন আগে
জাবির (রা.) বলেন, আমি নবী (স.)-কে তাঁর ওফাতের তিন দিন পূর্বে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা না নিয়ে মৃত্যুবরণ না করে।
নবীজি (স.) কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেন এবং দুই সাহাবির কাঁধে ভর দিয়ে জোহরের নামাজের জন্য মসজিদে যান। এসময় আবু বকর (রা.) ইমামতি করছিলেন, নবীজির উপস্থিতির আভাস পেয়ে সরে যাচ্ছিলেন, তখন নবীজি (স.) তাঁকে সামনে থাকতে ইশারায় নির্দেশ দেন। এ প্রেক্ষিতে আবু বকর (রা.)-এর ডান পাশে তাঁকে বসিয়ে দেয়া হল। এরপর আবু বকর (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সালাতের অনুকরণ করছিলেন এবং সাহাবিদেরকে তাকবির শোনাচ্ছিলেন।
এক দিন আগে
ওফাতের আগের দিন রবিবার নবী কারিম (স.) তাঁর দাসদের মুক্ত করেন, তাঁর কাছে সাতটি স্বর্ণ মুদ্রা ছিল তা সাদকা করে দেন এবং অস্ত্রগুলো মুসলিমদের হিবা করেন।
শেষ দিন (সোমবার)
ফজরের সময় তিনি আয়েশা (রা.)-এর ঘরের পর্দা সরিয়ে সাহাবিদের দিকে তাকান এবং মৃদু হাসেন। সাহাবিরা ভেবেছিলেন তিনি নামাজে অংশ নিতে চান, কিন্তু তিনি ইঙ্গিত করে আবু বকর (রা.)-কে ইমামতি চালিয়ে যেতে বলেন। সকালবেলা তিনি কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে ডেকে কানে কানে কিছু বলেন। প্রথমে তিনি কেঁদে ফেলেন, পরে আবার হাসেন। পরে ফাতিমা (রা.) জানান, প্রথমবার নবীজি (স.) মৃত্যুর সংবাদ দেন, দ্বিতীয়বার জানান তিনিই পরিবারের মধ্যে প্রথম তাঁকে অনুসরণ করবেন। এরপর তিনি হাসান-হুসাইন (রা.)-কে আদর করেন ও উপদেশ দেন।
তখন তিনি বলেন, ‘খায়বারে যে বিষাক্ত খাবার খেয়েছিলাম তার যন্ত্রণা এখনো অনুভব করছি।’
শেষ উপদেশ ও ইন্তেকাল
তাঁর শেষ উপদেশ ছিল: الصلاة، الصلاة، وما ملكت أيمانكم ‘নামাজ, নামাজ! আর তোমাদের অধীনে যারা আছে তাদের হক আদায় করো।’ এছাড়া তিনি বলেন- ‘ইহুদি-খ্রিস্টানদের মতো তোমরা কবরকে ইবাদতের স্থান বানিও না।’
একাদশ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার সূর্যোদয়ের পর আয়েশা (রা.)-এর কোলেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। মৃত্যুর আগমুহূর্তে তিনি মেসওয়াক ব্যবহার করেন এবং শেষ মুহূর্তে বলেন- الرَّفِيقِ الْأَعْلَى ‘সর্বোচ্চ সঙ্গী (আল্লাহ)-এর কাছে।’
দাফন ও উত্তরাধিকার
ওফাতের পর মুসলিম সমাজ শোকে ভেঙে পড়ে। আবু বকর (রা.) সুরা আলে ইমরানের আয়াত: ১৪৪ তেলাওয়াত করে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, মুহাম্মদ (স.) একজন রাসূল, আর আল্লাহ অমর। এরপর শুরা বৈঠকে আবু বকর (রা.)-কে প্রথম খলিফা নির্বাচিত করা হয়। রাসূল (স.)-কে তিনটি সাদা কাপড়ে কাফন দেয়া হয় এবং আয়েশা (রা.)-এর কক্ষেই দাফন করা হয়, যেমন তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন।
(সহিহ বুখারি: সহিহ মুসলিম: সিরাত ইবনে হিশাম; মুয়াত্তা মালিক; আর রাহিকুল মাখতুম)