বন্ধু বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের মানদণ্ড
বন্ধু বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের মানদণ্ড। প্রতীকী ছবি
মহান আল্লাহ মানুষের প্রকৃতি এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন, সে যেই পরিবেশে বসবাস করে, ধীরে ধীরে সেই পরিবেশের রীতি-নীতি নিজের ভেতরে ধারণ করে নেয়। মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী। সে অন্য মানুষের সঙ্গে মিশে জীবনযাপন করে। অন্যদের সঙ্গ গ্রহণ করে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, ভালোবাসে এবং তাদের ভালোবাসাও অর্জন করে। এই পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতর দিয়েই মানুষ কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বন্ধন গভীর ও দৃঢ় হয়ে ওঠে। বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক গঠনের নানা কারণ থাকে। কখনো তা হয় পারস্পরিক উপকারের ভিত্তিতে, কখনো সম্পদ ও ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে, আবার কখনো কেবল হৃদয়ের টানেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
এভাবেই মানুষ তার পরিচিতদের মধ্য থেকে কাউকে বিশেষ বন্ধু হিসেবে বেছে নেয়। সেই বন্ধুর সঙ্গে তার সম্পর্ক অন্য সবার তুলনায় গভীর হয়। সে তার সঙ্গে বেশি সময় কাটায়। তার সঙ্গে বেশি কথা বলে। তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে। এমনকি কখনো কখনো তার আচরণ, চিন্তাভাবনা ও জীবনযাপনকেও অনুসরণের মতো আদর্শ মনে করে।
মানুষের এই স্বভাব আসলে তার সামাজিক ও মানসিক গঠনেরই এক অনিবার্য ফল। কারণ সে একা বাঁচতে পারে না, বরং সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুকে অনুকরণ করে। তাই তোমাদের প্রত্যেকের খেয়াল রাখা উচিত, কাকে বন্ধু বানানো হচ্ছে।’ (আবু দাউদ)
এই হাদিস আমাদের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্যের এক দিকে ইঙ্গিত করে। মানুষ যার সঙ্গে মিশে, যার সান্নিধ্যে থাকে, তার প্রভাব অবধারিতভাবে তার চিন্তা, বিশ্বাস, চরিত্র ও জীবনাচারে প্রতিফলিত হয়। বন্ধুত্ব শুধু একসময় মানুষের অন্তর ও চিন্তার গতিকে নির্ধারণ করে।
এই কারণেই নবী করিম (সা.) সঙ্গী নির্বাচন ও মেলামেশার বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ভালো ও খারাপ সঙ্গীর প্রভাব বোঝাতে চমৎকার উপমা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সৎ ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা ও কামারের মতো। আতর বিক্রেতার সঙ্গে বসলে তিনটি বিষয়ের কোনো একটি হয়। সে হয়তো তোমাকে সুগন্ধির উপহার দেবে। অথবা তুমি তার কাছ থেকে কোনো সুগন্ধি কিনবে। কিংবা অন্তত তার সান্নিধ্যে বসে মনোরম ঘ্রাণে পরিতৃপ্ত হবে। অন্যদিকে কামারের সঙ্গে বসলে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে। সে হয়তো তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দেবে। অথবা অন্তত তার ধোঁয়া ও দুর্গন্ধে তুমি বিরক্ত হবে।’ (সহিহ মুসলিম) এই উপমা দ্বারা রাসুল (সা.) বোঝাতে চেয়েছেন, ভালো বন্ধুত্ব মানুষকে নৈতিকতা, জ্ঞান ও উত্তম চরিত্রের পথে এগিয়ে দেয়, আর খারাপ সঙ্গী মানুষকে ধীরে ধীরে পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
তাই ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, যাদের সঙ্গে আমরা সময় কাটাই, যাদের কথা শুনি, যাদের পথ অনুসরণ করি, তাদের নির্বাচন হোক প্রজ্ঞা ও সচেতনতার ভিত্তিত্তে। কারণ বন্ধুত্ব শুধু সম্পর্ক নয়, এটি মানুষের আত্মা ও জীবনের দিকনির্দেশক শক্তি।
যে মানুষ আল্লাহর হক এবং বান্দার হক পূর্ণভাবে আদায় করে, সেই মানুষই প্রকৃত সৎ ও নেক। সে ব্যক্তি কোরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত আদর্শ হয়ে ওঠে। এমন মানুষ কেবল নিজের জন্য নয়, বরং অন্যদের জন্যও কল্যাণকর হয়। তার সঙ্গ থেকে আল্লাহতায়ালা উপকার দান করেন। এমন নেক বন্ধুর উদাহরণ হলো এক আতর বিক্রেতার মতো। যতই তার সঙ্গ লাভ করা যায় ততই ঘ্রাণে ঘ্রাণে সুবাসিত হওয়া যায়।
ঠিক তেমনিভাবে যারা আল্লাহর বন্ধুদের সান্নিধ্যে আসে, তাদের সোহবত ও সংশ্রব গ্রহণ করে, তারাও আল্লাহর নৈকট্যের এক বিশেষ স্বাদ অনুভব করে। কেননা এসব মনীষীর সঙ্গে মহান আল্লাহর এক গভীর সম্পর্ক থাকে। তাই মানুষ যত বেশি তাদের কাছাকাছি হবে, যত বেশি তাদের সঙ্গে বসবে, ততই সে উপকার ও কল্যাণ লাভ করবে।