দমননীতিতে স্তব্ধ নয়, ক্ষোভে ফুঁসছে প্রাথমিক শিক্ষা
জাকিরুল ইসলাম
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি পূরণের বদলে সরকার যে দমনমূলক নীতি, শোকজ, ও দূরবর্তী বদলির পথ বেছে নিয়েছে, তা কেবল অগণতান্ত্রিকই নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষার জন্য এক মারাত্মক অশনি সংকেত। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই দমননীতি সাময়িক স্থবিরতা আনলেও, এর গভীরে চাপা পড়া ক্ষোভ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে যেকোনো মুহূর্তে বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। শিক্ষকরা থেমে নেই, পরীক্ষা শেষ হলেই আসছে আরও কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি।
হুমকি-ধামকিতে ক্ষণিকের শান্তি, চিরস্থায়ী হতাশা :
প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলন দমনে সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, তা কোনো সুস্থ সমাধানের পথ হতে পারে না।
শোকজ ও বদলির খাঁড়া: আন্দোলনরত ও নেতৃত্বদানকারী শিক্ষকদের শোকজ করা, নিজ জেলার বাইরে এমনকি ৪০০ কিলোমিটার দূরে বদলি করে দেওয়া এবং চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো – এই পদক্ষেপগুলো শিক্ষকদের মধ্যে চরম ভীতি ও হতাশার সৃষ্টি করেছে।
নেতিবাচক প্রভাব (তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী):
ক্লাসে আন্তরিকতার অভাব: যেসব শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া হয়েছে বা বদলি করা হয়েছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই মানসিক চাপে থাকবেন। এর ফলে পাঠদানে তাদের আন্তরিকতা ও মনোযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। মন থেকে শিক্ষা দেওয়ার মানসিকতা নষ্ট হলে ক্লাসের মান কমতে বাধ্য।
অন্যদের ভীত করা: এই দমননীতি অন্যান্য শিক্ষকদেরও ন্যায্য দাবি নিয়ে মুখ খুলতে ভয় দেখাবে। ফলে সৃষ্টি হবে একটি নীরব, কিন্তু ক্ষুব্ধ কর্মপরিবেশ।
প্রাথমিক শিক্ষার মানের পতন: শিক্ষকদের সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা না বাড়ালে মেধাবীরা এই পেশায় আসবে না। বিদ্যমান শিক্ষকরাও যদি ভীতি ও হতাশায় ভোগেন, তবে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে।
শিক্ষকদের এই বঞ্চনা সমাজে তাদের মর্যাদাহানি ঘটাচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের মনেও শিক্ষকদের প্রতি সম্মান কমাতে পারে। সামাজিক মর্যাদার এই নিম্নগামিতা উন্নত জাতি গঠনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
দাবি উপেক্ষা: আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে শিক্ষকরা
সরকার হয়তো ভেবেছে, কঠোর দমননীতিতে শিক্ষকরা পিছু হটবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ১১তম গ্রেড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা কার্যকর না করা, শিক্ষকদের মধ্যে চরম আস্থা সংকট তৈরি করেছে। শিক্ষকরা মনে করছেন, সরকার আলোচনার পথ বন্ধ করে জোরপূর্বক আন্দোলন থামানোর কৌশল নিয়েছে।
বিশ্রাম নয়, প্রস্তুতি: বর্তমানে বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণের কারণে শিক্ষকরা সাময়িকভাবে কর্মসূচিতে বিরতি দিয়েছেন। তবে এটি আন্দোলনের শেষ নয়, বরং বিরতি। শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠনের মোর্চা, যেমন 'প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ' ও 'সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ', পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুনরায় বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
'ডু অর ডাই' মানসিকতা: আপনার আলোচনা অনুযায়ী, যখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায় এবং সম্মান ও আর্থিক সুরক্ষা নিয়ে আপস করা সম্ভব হয় না, তখন শিক্ষকরা 'ডু অর ডাই' মানসিকতা নিয়ে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে পারেন। এটি পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি বা অচল কর্মসূচিতে গড়াতে পারে, যা দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে স্থবির করে দেবে।
ন্যায্য দাবি: বিনিয়োগ ও মর্যাদার প্রশ্ন
শিক্ষকদের মূল দাবিগুলো সম্পূর্ণভাবে যৌক্তিক এবং উন্নত জাতি গঠনের জন্য অপরিহার্য।
১০ম গ্রেড চাই: স্নাতক পাস করা সত্ত্বেও অন্য ডিপার্টমেন্টের ১০ম গ্রেডের কর্মীদের চেয়ে সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেড (চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে শুরু) পাচ্ছেন। এই গ্রেড বৈষম্য দূর করে ১০ম গ্রেড নিশ্চিত করা জরুরি, যা তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা দেবে।
পদোন্নতির সুযোগ: শিক্ষকদের পদোন্নতির সুযোগ না থাকা হতাশার অন্যতম কারণ। শতভাগ পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কাজে লাগানো প্রয়োজন।
উচ্চতর গ্রেড বাস্তবায়ন: পে-স্কেল অনুযায়ী প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেড (১০ ও ১৬ বছর পর) দ্রুত বাস্তবায়ন করে আর্থিক বঞ্চনা দূর করা উচিত।
তাই, শিক্ষা নয়, শিক্ষককে বাঁচান:
শিক্ষকদের হুমকি ও বদলি দিয়ে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া গেলেও, এই দমনমূলক নীতি দীর্ঘমেয়াদে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেবে। শিক্ষা খাতে অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ বা সর্বজনীন উপবৃত্তির মতো পদক্ষেপের চেয়ে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।
যদি শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা ও সম্মান নিশ্চিত করা হয়, তবেই মেধাবীরা এই পেশায় আসবে এবং তারা আন্তরিকতা নিয়ে পাঠদান করবেন। দমন-পীড়ন নয়, বরং আলোচনা, মর্যাদা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সরকারের একমাত্র কার্যকর পথ। শিক্ষকদের অসন্তোষ যদি আন্দোলনের রূপ নিয়ে স্থায়ী হয়, তবে দেশের ভবিষ্যতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব হবে অপূরণীয়।
লেখক :শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল