তারেক রহমানের দেশে ফেরা রাজনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস

তারেক রহমানের দেশে ফেরা রাজনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস

সংগ্রহীত ছবি

১৭ বছরের বেশি সময় পর আজ স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁকে বহনকারী বিমান সিলেটে যাত্রাবিরতি দিয়ে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবে দুপুরে। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দলের নেতাকর্মীরা যেমন উজ্জীবিত, তেমনি বিভিন্ন দলের নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের এই ফেরা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো স্বাভাবিক এবং নির্বাচনমুখী করতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। সে জন্য তাঁর এই উপস্থিতি দেশের মানুষ ও দলের জন্য স্বস্তির।

 

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর আটক করা হয় তারেক রহমানকে। ১৮ মাস কারাগারে থাকার সময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারামুক্ত হয়ে ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য স্ত্রী-কন্যাসহ যুক্তরাজ্যের লন্ডনে রওনা হন। ২০১৮ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগের দিন দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

 

 

বলা চলে মায়ের অনুপস্থিতিতে এরপর তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন। দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে সাংগঠনিকভাবে বিএনপিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, সংগঠিত করেছেন তিনি। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তিনি সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলেন। তারেক রহমান বাংলাদেশের একমাত্র নেতা যিনি এত দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকার পর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করছেন।

 

 

তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারেক রহমানের দেশে আসাকে স্বাগত জানাই। বাস্তবিক অর্থে তিনি একজন সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে দেশে ফিরছেন। ১৭ বছরে ছোট ভাইকে হারানো, মায়ের গুরুতর অসুস্থতা, কারা ভোগ করা, এত দূর থেকে বিএনপির মতো বড় একটি দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, নতুন এক অভিজ্ঞতা। বিশ্বে এ রকম উদাহরণ খুব বেশি নেই। এটি নিশ্চয়ই তাঁর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয়।

 

 

দেশের রাজনীতির খুব জটিল সময়ে তিনি দেশে ফিরছেন। এর মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি হবে, সাধারণ মানুষ—যারা নির্বাচন চাচ্ছে, তাদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আস্থার জায়গা তৈরি হবে। তাঁর এই ফেরা দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে—যারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। আর যারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে না—তাদের অবস্থা ভিন্ন হতে পারে।’
গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষটি জোর আলোচনায় উঠে আসে। সব অপেক্ষার প্রহর শেষে তারেক রহমান মাতৃভূমির মাটিতে পা রাখছেন আজ। কিন্তু বিশিষ্টজনরা বলছেন, আরো আগেই তাঁর দেশে ফেরা উচিত ছিল। এই ফেরা তাঁর জন্য যেমন আনন্দের, আরেক দিকে কষ্টেরও।

 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আড়াই বছর দেশের বাইরে ছিলাম। আমার কাছে অপশন ছিল জেলে যাওয়া, না হয় বিদেশে গিয়ে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। দেশে ফেরার আনন্দে মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। আমি যখন দেশে ফিরতে ব্যাঙ্কক এয়ারপোর্টে পৌঁছেছিলাম তখন আনন্দে আমার চিন্তাশক্তি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। ব্যাঙ্ককে যখন বিমানে উঠলাম তখন মনে হচ্ছিল বিমান কেন দেশে নামছে না!’

তিনি বলেন, ‘তারেক রহমান যে বাড়ি থেকে লন্ডনে গিয়েছিলেন সে বাড়িতে তো আর উঠতে পারবেন না। তারপর তিনি তাঁর ছোট ভাইকে হারিয়েছেন, দেশে সুস্থ মাকে রেখে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এখন ভীষণ অসুস্থ। তো তারেক রহমানের অনুভূতিটা আরো অন্য রকম হবে। এই ফেরায় আনন্দ-বেদনা দুটিই থাকবে।’

জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত তারেক রহমানের 

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তারেক রহমানের সভাপতিতে স্থায়ী কমিটি নিয়মিত একটি এজেন্ডাভিত্তিক বৈঠক শুরু করে। ২০১৮ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের অনুমতি দেন তারেক রহমান। এরপর নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত সদস্যরা তারেক রহমানের নির্দেশেই সংসদে যান। একমাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। তৃণমূল নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেন। এরপর দেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেন, কিভাবে বাংলাদেশে একটি স্বচ্ছ নির্বাচমুখী ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। সেই আলোচনা ও বিশিষ্টজনদের পরামর্শের ভিত্তিই রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত শুরু হয়। ২০২২ সালে তারেক রহমান রাষ্ট্র গঠনে ২৮ দফা ঘোষণা করেন। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তা বাড়িয়ে ৩১ দফা করা হয়। যুগপৎ সঙ্গীদের প্রতিটি দল ৩১ দফা ঘোষণা করে। এভাবে বিএনপিকে ডানপন্থী ঘরানার রাজনৈতিক দল থেকে বের করে মধ্যমপন্থী এবং বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করার সূত্রপাত হয়। এই সূত্রপাতের মূল ভূমিকায় ছিলেন তারেক রহমান। তাঁকে সহযোগিতা করেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারেক রহমান বিদেশে থেকে একটি ফ্যাসিবাদী সরকারকে সরাতে নেতৃত্ব দিয়ে সাফল্য অর্জন করেছেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তাঁর দেশে ফেরার ফলে মানুষের মনোজগতে বলুন, রাজনৈতিক আচরণে বলুন—একটা প্রভাব পড়বে। তাঁর দেশে ফেরার কারণে দেশের মধ্যে যেসব অস্থিরতা বিরাজ করছে সেগুলো অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে নতুন বাংলাদেশে তারেক রহমানের ইতিবাচক নেতৃত্ব দেখানোর সুযোগ এসেছে। তিনি দেখিয়েছেন কর্তৃত্ববাদী সরকারকে কিভাবে সরাতে হয়। আর এখন সুযোগ এসেছে কিভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা যায়।’