উচ্চজনের কঠিন নীচতা

উচ্চজনের কঠিন নীচতা

সংগ্রহীত ছবি

সাহিত্যের দন্ত্য স বুঝতে চার যুগ পার করে দিতে হয় যাদের ঘটনাক্রমে তাদের কেউ যদি পেয়ে যায় সাহিত্যমূল্য বিচারের দায়িত্ব, তখন প্রকৃত বোদ্ধারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত না হয়ে পারেন না। তাঁরা বিস্ময়মিশ্রিত প্রশ্নও করেন, যোগ্য লোকের কি এতই আকাল?

রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় যে দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেছি বছর চারেক, তার সম্পাদক ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী ২০০৪ সালের রমজান মাসের মাঝামাঝি সময় আমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন ঈদুল ফিতর বিশেষ সংখ্যার জন্য গল্প ও প্রবন্ধ বাছাই করার দায়িত্ব। আমার জ্ঞানবৃদ্ধি যে দন্ত্য স’র কাছাকাছিও নয়, তা যাদের পরিষ্কার জানা তাদের অন্যতম এহসানুল করিম হেলাল। আমার এই প্রাণসখা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সান্ধ্য আড্ডায় মন্তব্য করেন : গরুতে বাজাবে তাম্বুরা আর শ্রোতারা খাবে জাম্বুরা/এমন কী-ই বা আছে দুঃখ পাওয়ার, কুঁজোর তো হবেই সাধ চিৎ হওয়ার।

হেলালের মন্তব্যের আগের বছর সাহিত্যে একুশে পদক জয় করেন যে কবি, তাঁর যোগ্যতা-প্রতিভা নিয়েও নানাবিধ মুখরোচক কথা শোনা গিয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, ‘পক্ষীর নামটা তোতা/মোর নামটা ভোঁতা’ ধরনের পদ্যলেখককে মর্যাদাদায়ক পদকে ভূষিত করার তামাশা কি এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল? প্রবীণ সাংবাদিক এরশাদ মজুমদার বলেন, মূল ঘটনাটা না জেনে খালি নিন্দামন্দর চর্চা! এ ভারি অন্যায়। যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়ায় একজন পদ্যকারের যে জীবনরক্ষা পেল সেজন্য কর্তৃপক্ষের তারিফ করেছ?

জীবনরক্ষা! সেটা আবার কী? জবাবে বলা হয়, মরতে না দেওয়া আর কী। আই মিন লাইফ সেভিং।

পাঁচ বছর ধরে পদকের জন্য কবিপ্রবর নানা জায়গায় ধরনা দিয়েছেন। প্রতিবারই তাঁর কেস অ্যাকটিভলি কনসিডার করার আশ্বাস দেওয়া হয়। কার্যত কবিকে দেওয়া হয়েছে কাঁচকলা। মজুমদার বুলেটিন জানায়, তাই বাধ্য হয়ে কবি ঘোষণা দেন, ‘না পাই যদি পদক/অবশ্যই মম মড়ক’।

হুমকি কার্যকর করার জন্য নগরীর সুউচ্চ ভবনের ছাদে আরোহণ করেন কবি। আত্মহত্যা থেকে তাঁকে নিবৃত্ত করার পথে এগিয়ে গিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

পদককেন্দ্রিক এই রসিকতার আদলে হেলাল আমায় চিৎ হওয়ার সাধনারত কুঁজোর সমান্তরাল করেন। তবে আমার বাছাই করা গল্পগুলোর একটি পড়ে যারপরনাই খুশি হন তিনি। গল্পের বিষয়বস্তু হলো : উপরে উপরে তীব্র আলো অথচ ভিতরে গাঢ় কালো।

মোট ছয়টি গল্প নির্বাচন করেছিলাম। তার মধ্যে ছাপানো সম্ভব হয়েছে তিনটি। প্রবন্ধ নির্বাচিত হয় পাঁচটি, প্রকাশিত হয় তিনটি। যাঁদের লেখা ঈদসংখ্যায় ঠাঁই পেয়েছিল তাঁরা সবাই মফস্বলের বাসিন্দা।

২. তীব্র আলো আর গভীর কালোবিষয়ক গল্পটি লিখেছেন সুনীল আবেদ গোমেস। নামে রয়েছে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান কৃষ্টির মিশেল। বগুড়া থেকে আসা এই গল্পের নির্মাতা, আমার ধারণা, উপজেলা পর্যায়ের কোনো সরকারি কর্মকর্তা। অভিজ্ঞতা থেকে জানি, সাহিত্যচর্চার পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তারা নিজের প্রকৃত নাম আড়ালে রাখাটা উপভোগ করেন। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সদস্য মঞ্জুরুল করিম ১৯৭১ সালে আমার জেলায় ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি সচিব পদে উন্নীত হন। ‘ইমরান নূর’ নামে কবিতা লিখতেন মঞ্জুরুল করিম। অল্প কদিন আগেও দুদকের চেয়ারম্যান পদে ছিলেন প্রাক্তন সিভিল সার্ভেন্ট ড. আবদুল মোমেন। তিনি অসাধারণ লেখক; লেখেন ‘আন্দালিব রাশদী’ নামে।

সুনীল আবেদ গোমেস রচিত গল্পে ছিল নতুনত্ব। এজন্য তাঁর লেখা আর কোথায় কোথায় বেরোয় নজর রেখেছি। কিন্তু দেখতে পাইনি। হতে পারে বেরিয়েছিল, আমার চোখে পড়েনি। হতে পারে, খেয়ালের বশে একটি মাত্র গল্প লিখে ক্ষ্যান্ত দিয়েছেন। তিনি তাঁর গল্পের শিরোনাম দিয়েছিলেন, ‘এ দেখা সে দেখা নয়’। ওটা বদলে দিয়ে আমি করেছি-‘উচ্চজনের কঠিন নীচতা’। এর সারকথা বর্ণনার আগে বলা যাক, প্রকাশিত দ্বিতীয় গল্প সিরাজ আখন্দ রচিত ‘চোখ থাকিতে অন্ধ’র সারকথা।

শুরু এভাবে-‘হুসনা বানু তার ছোট ভাই সুজনের স্ত্রী লুতফার দোষত্রুটি আবিষ্কারেই শুধু নয়, উদ্ভাবনেও ব্যস্ত থাকেন। হুসনার কলেজপড়ুয়া মেয়ে দিশ্না তার মামির কানের দুল পরে বান্ধবীর বার্থডে পার্টিতে যেতে চেয়েছিল, লুতফা দুল দেয়নি। বলেছে, হারিয়ে ফেললে তোর বাবা কি আমায় নতুন দুল কিনে দেবে? হুসনা বলেন, অবশ্যই দেবে। লুতফা বলে, কোথা থেকে দেবে? শ্বশুরবাড়ির ভর্তুকি ছাড়া সংসার চালাতে যার ওঠে নাভিশ্বাস, সে করবে ক্ষতিপূরণ?

‘লুতফা হিংসুক। লুতফা অভদ্র। লুতফা অহংকারী। ওর বাবা ছিলেন ঘুষখোর গভর্নমেন্ট অফিসার। হারাম পয়সার চাল-ডাল খাওয়া মেয়ের কী দেমাক! মানুষকে মানুষই মনে করে না। ওর ভাই আতাহার আস্ত একটা গুন্ডা। চাঁদাবাজি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। ছয় মাস জেল খেটেছে। মাস্তানের বোনের ভাবখানা দেখ! যেন সম্রাট শাজাহানের ভগ্নী।’ এই স্টাইলে কুৎসাচার চালান হুসনা বানু। এতে ঘোরতর আপত্তি জানায় দিশ্না। বলে, মা কী যা তা বলে বেড়াচ্ছে। মামির বাবা আর ভাই খুবই ভালো মানুষ। তাদের বিরুদ্ধে যত বদনাম গাইবে ততই লোকে তোমাকে খারাপ ভাববে।

সৌভাগ্যক্রমে সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে হলো দিশ্নার। একদিন তার ভাশুরের কলেজপড়ুয়া মেয়ে বকুল তার চাচির কানের দুল পরে সিনেমায় যেতে চায়। দিশ্না বলে, যদি হারিয়ে ফেলিস? এই নিয়ে চাচি-ভাশুরকন্যার বাদানুবাদ চলতে থাকে। এ সময় দিশ্নার স্বামী কাবুল এসে বকুলের পক্ষ নেয়। স্বামী-স্ত্রী তর্কাতর্কির পর্যায়ে কাবুল কশিয়ে চপেটাঘাত করে দিশ্নাকে। ঘটনা জানতে পেরে হুসনা বানু হুংকার দেন; বেয়াইবাড়ির সবাইকে জেল খাটাব। দিশ্নার গয়না দিশ্না দেবে না, সেজন্য তার গায়ে হাত তুলবে! এত স্পর্ধা ছোটলোকটার?

‘চোখ থাকতে অন্ধ হও কেন আপু?’ বলে সুজন, ‘আমার বউ তোমার মেয়েকে গয়না না দেওয়ায় ওর কত গিবতই না তুমি গেয়েছ। সেটা কি তোমার ছোটলোকেমি ছিল না? নিজের বেলায় বুলবুল, পরের বেলায় খাট্টাকুল, এই নিয়মে চলা আর কত দিন আপু?’

৩.

ভাগ্যগুণে ল্যাংড়াও এভারেস্ট চূড়ায় ওঠে। অনেকটা সেভাবেই উঁচুতলার মানুষ হয়ে গেছে মুহাম্মদ আজমল। কোটিপতি হওয়ার পর সে নিজের নাম রাখে ‘আজমল চৌধুরী। তবে তার নিজ গ্রাম নিত্যপুরের বাসিন্দারা তাকে আগের মতোই ‘হোরণবিবির পোলা’ বলে। আড়ালেই বলে। সামনাসামনি বলে ‘চোদ্রি সাব’। অভিজাত যিনি তাঁর মর্যাদা রক্ষা করার কাজ তো তাদেরই যারা অনভিজাত। সুনীল আবেদ টমাস লিখেছেন, সম্পদে বলীয়ানকে বিত্তে দুর্বলজন কুর্নিশ করবে প্রকাশ্যে আর মনে মনে তাঁকে ছুড়ে ফেলবে হাবিয়া দোজখে, এই প্রথা কার সাধ্য রদ করে। অভিজাতরা বিষয়টা জেনেবুঝেই হজম করে চলেছে।

শহরে আজমলের সাতটি বাড়ি। নতুন নতুন জমি কিনে গ্রামের বাড়ির এলাকাও সে বাড়িয়েছে। বাড়ির সুদৃশ্য তোরণ অনেক দূর থেকে দেখা যায়। পারিবারিক গোরস্তান করা হয়েছে মসজিদের পাশেই। মৃত্যুর পর আজমলকে দাফন করা হয়েছে এখানেই। আজমল চৌধুরীর রেখে যাওয়া ব্যবসা, শিল্পকারখানা, স্থাবর সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব বর্তেছে তার ছোট ছেলে মজির চৌধুরীর ওপর। মজির, তার বড় দুই ভাই সগির ও নজির আমেরিকায় পড়ালেখা করেছে। তারা আচার আচরণে তাদের জন্মদাতার চেয়েও চার গুণ বেশি অভিজাত। ছোটলোকি কাজকর্ম দেখলে তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।

রোকন শেখ নামের এক ‘ছোটলোক’ বলে বেড়িয়েছিল যে ফোরকান বিবির পেশা ছিল গ্রামের বড়লোকদের বাড়িতে রান্না করা। মহিলার ছেলে আজমল ছিল একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে বাবুর্চির হেলপার। সেই আজমল চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে অবাঙালি ব্যবসায়ীর মালগুদাম দখল করে। লোকটা ছিল হানাদার পাকিস্তান সেনার দালাল। তাই নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়টায় প্রাণরক্ষার্থে তাকে ব্যবসাবাণিজ্য ফেলে পালাতে হয়েছিল। গুদামে ছিল আট লাখ টাকার পণ্য। এগুলো আলাদিনের চেরাগ হয়ে আজমলের কপাল খুলে দিয়েছিল।

যে পাখি আকাশে অনেক ওপরে, তাকে নিচে দুর্গন্ধময় নর্দমার পানিতে চুবিয়ে রাখার মতো কাজই করেছে রোকন শেখ। ছোটলোকের এত বড় স্পর্ধা উচ্চজন কখনোই সয় না। মজিরও সয়নি। তার নির্দেশে রোকনের ঠ্যাং ভেঙে দেয় দুর্বৃত্তরা। মজির ঘোষণা দেয়, রোকনের চিকিৎসার খরচ যত লাগে আমি দেব এবং দিয়েছেও।

আজমলের জীবদ্দশায় তার বোন হনুফা পালিয়ে গিয়ে এক ট্রাকচালককে বিয়ে করেছিল। আটাশ বছর পরে বোনটি মারা যায়। হনুফার শেষ ইচ্ছা অনুসারে তাকে দাফন করা হয় পিত্রালয়ের গোরস্তানে। দাফনের তিন দিন পর শহর থেকে নিত্যপুর আসে মজির। ছোটলোককে বিয়ে করায় যে ফুফুকে ত্যাজ্য করেছিলেন বাবা, তার কবর এখানে হতেই পারে না। মজিরের নির্দেশে হনুফার লাশ তুলে এনে সড়ক পাশে ফেলে রাখা হয়। বিধবা, নিঃসন্তান হনুফার শবাধার দেখার জন্য বহু মানুষ ভিড় জমায়। এক সমাজসেবী সংস্থার লোকরা এসে নতুন জায়গায় দাফনের জন্য লাশটা নিয়ে যায়।

৪. সুনীল আবেদ টমাস লিখেছেন, গ্রামের যারা হনুফার লাশ দেখতে গিয়েছে তাদের নাম সংগ্রহ করে মজির। ‘লাশ কেন দেখলি?’ সরাসরি এটা না বলে, সে এদের প্রত্যেককে নানারকম নষ্টামির মাধ্যমে ‘সাজা’ দেয়। যেমন একজনকে বলা হয়, ‘মসজিদের বাগান থেকে তোর ছেলে ফুল ছিঁড়ে নিয়েছে। ক্ষতিপূরণ বাবদ তিন শ টাকা দে।’ লোকটা বলে, ‘সাত বছর বয়সি অবুঝ ছেলে একটি মাত্র ফুল তুলেছে। এ জন্য তিন শ টাকা? এ তো জুলুম হুজুর।’ মজির বলে, ‘জুলুম কেন হবে? নে আমি তোরে তিন শ টাকা দিচ্ছি। এবার তুই জরিমানা দাখিল কর।’ লোকটা বলে, ‘টাকা আপনি দিলেও অন্যায় তো অন্যায়ই। একটা ফুলের দাম কিছুতেই তিন শ টাকা হতে পারে না।’ মজির বলে, ‘বেয়াদপের হাড্ডি কোথাকার! মুখে মুখে তর্ক করছিস। তোরে তো চাবকানো দরকার। ঠিক আছে কান ধরে পঞ্চাশবার ওঠবস কর।’

মজিরের ইতরামোর কাহিনি পড়ে চোখে ভেসে ওঠে গল্পের সেই মদন পোদ্দারের ছবি। মদনের কর্মসূচি হলো, মাসে কম করে হলেও তিন দিন বউ পেটানোর। এজন্য সে একটা না একটা অজুহাত খাড়া করবেই। এভাবে বিবাহিত জীবনের পনেরো বছর কেটেছে। পরবর্তী বছরের মাঘ মাস যায় যায় অবস্থায়ও অজুহাতের অভাবে বউ পেটানো কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা যাচ্ছিল না।

মওকা এসে গেল মাঘের শেষ দিনে। কর্মস্থল থেকে দুপুরে খাবার খেতে বাড়ি ঢোকে মদন পোদ্দার। বউকে বলে, উঠোনে দেখলাম একটা কুকুর শুয়ে আছে। ওকে খেতে দিয়েছিস? বউ বলে, ‘দিয়েছি। পেট ভরে খেয়েছে বলেই তো আরামসে ঘুমোচ্ছে।’

ব্যস্। অমনি বউ পিটুনি শুরু। বউয়ের প্রশ্ন : আরে আমার কী দোষ। মারছে কেন? ‘মারছি তোর বেআক্কেলি ছাড়ানোর জন্য’ বলে মদন পোদ্দার, ‘কুকুরটা ঘুমোচ্ছে দেখছিস তবু ওর মাথার নিচে একটা বালিশ গুঁজে দিলি না! বালিশ দিতে কে বারণ করেছে অ্যাঁ?

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন