ধৈর্যের উপদেশ: সফলতার এক অপরিহার্য শর্ত

ধৈর্যের উপদেশ: সফলতার এক অপরিহার্য শর্ত

ফাইল ফটো

ইসলামি জীবনদর্শনে ‘সাফল্য’ বা ‘মুক্তি’ একটি বিস্তৃত ধারণা। এটি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত বা কিছু নির্দিষ্ট নেক আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যক্তি, সমাজ ও উম্মাহর সম্মিলিত কল্যাণ ও আত্মিক উন্নয়ন এর অন্তর্ভুক্ত। এই মহৎ লক্ষ্য অর্জনে ব্যক্তিগত ধৈর্য (সবর) এবং একে অপরকে ধৈর্যের উপদেশ দেওয়াকে ইসলামে সাফল্যের অন্যতম মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সুরা আল আসর-এ মহান আল্লাহ সময়ের শপথ করে মানবজাতির জন্য সফলতার চিরন্তন মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, সব মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত কেবল তারা ছাড়া যারা চারটি গুণ অর্জন করে: ঈমান, নেক আমল, সত্যের উপদেশ এবং ধৈর্যের উপদেশ। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, আল্লাহ কেবল ধৈর্য ধারণের কথা বলেননি; বরং একে অপরকে ধৈর্যের উপদেশ দেওয়ার ওপর সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। এতে প্রতীয়মান হয়, ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি একটি ধৈর্যশীল সমাজ গঠনই প্রকৃত সফলতার ভিত্তি।

ইসলামি দর্শনে ধৈর্য কেবল বিপদের সময় স্থির থাকা নয়; বাস্তবে এটি একটি বহুমাত্রিক গুণ। ইবাদতে অবিচল থাকা, প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আদর্শচ্যুত না হয়ে আত্মসংযম বজায় রাখা সবই ধৈর্যের অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা: ১৫৩) এই ঐশী আশ্বাস একজন মুমিনকে কঠিন সময়েও দৃঢ় ও আশাবাদী রাখে।

আরও পড়ুন: সবরের বিস্ময় 

সত্যের পথে চলতে গিয়ে মানুষকে নানা বাধা, উপহাস ও বৈরিতার সম্মুখীন হতে হয়। এই বাস্তবতা তুলে ধরেই লুকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে উপদেশ দেন- ‘সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধারণ করো।’ (সুরা লোকমান: ১৭) অর্থাৎ দ্বীন প্রচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ধৈর্য অপরিহার্য।

মানুষ স্বভাবতই আবেগপ্রবণ ও চঞ্চল। বিপদের মুখে অনেক সময় সে দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। এমন মুহূর্তে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ থেকে দেওয়া ধৈর্যের উপদেশ তাকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করে। এ প্রসঙ্গে মহানবী (স.) বলেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতার উদাহরণ একটি দেহের মতো; যার একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে পুরো শরীর কষ্ট পায়।’ (সহিহ বুখারি) এটি প্রমাণ করে, একে অপরকে ধৈর্যের পথে দৃঢ় থাকতে সহায়তা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধৈর্যের উপদেশ এক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। সংকটের সময় এটি মানুষকে উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা থেকে বিরত রাখে এবং সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের পুরস্কার পূর্ণভাবে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।’ (সুরা জুমার: ১০) এই অফুরন্ত প্রতিদান শুধু ব্যক্তিগত ধৈর্যের জন্য নয়; বরং সমাজে ধৈর্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টার জন্যও প্রযোজ্য।

মুফাসসিরিনদের মতে, সুরা আল-আসর-এ ‘সত্যের উপদেশ’ ও ‘ধৈর্যের উপদেশ’ পাশাপাশি উল্লেখ করার মধ্যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। সত্যের পথ কণ্টকাকীর্ণ; তাই সেই পথে টিকে থাকার শক্তি জোগায় ধৈর্য। এই দুটি গুণ একে অপরের পরিপূরক- ধৈর্য ছাড়া সত্য প্রতিষ্ঠা দুরূহ, আর সত্য ছাড়া ধৈর্যের লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যায়।

মানবজাতির শ্রেষ্ঠ আদর্শ মহানবী (স.)-এর জীবনেও ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। মক্কার অমানুষিক নির্যাতন ও তায়েফের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্যেও তিনি অটল ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত অব্যাহত রেখেছেন।

ইসলামি আদর্শে ব্যক্তিগত সাফল্য ও সামাজিক মুক্তি অবিচ্ছেদ্য। সুরা আসর-এর শিক্ষার আলোকে বলা যায়, ইহকাল ও পরকালের চূড়ান্ত ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে ঈমান ও সৎকর্মের পাশাপাশি সত্য ও ধৈর্যের চর্চাকে সমাজব্যাপী প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাই শুধু নিজে ধৈর্যশীল হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং অন্যকে ধৈর্যের পথে আহ্বান জানানো প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব এবং সফলতার এক অপরিহার্য শর্ত।