ট্রাম্পের ‘আসল প্রেমকাহিনী’ নিয়ে সাবেক সহযোগীর বিস্ফোরক দাবি

ট্রাম্পের ‘আসল প্রেমকাহিনী’ নিয়ে সাবেক সহযোগীর বিস্ফোরক দাবি

সংগৃহীত ছবি

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্পের সম্পর্কের সূত্রপাত নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক দাবি করেছেন মেলানিয়ার এক সাবেক সহযোগী। তার দাবি, মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প একসময় কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের "এসকর্ট" (যৌন সঙ্গী) হিসেবে কাজ করতেন এবং এপস্টাইনের মাধ্যমেই ট্রাম্পের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল।

সাবেক ব্রাজিলীয় মডেল আমান্দা উঙ্গারো একটি রেকর্ড করা অডিওতে এই বোমা ফাটিয়েছেন। তিনি তার সাবেক সঙ্গী তথা মডেলিং এজেন্ট থেকে মার্কিন প্রশাসনের বিশেষ দূত হওয়া পাওলো জাম্পোল্লির বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ তুলেছেন। জাম্পোল্লি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, ১৯৯৮ সালের একটি পার্টিতে তিনিই মেলানিয়া ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

জাম্পোল্লির মডেল হিসেবে নিউইয়র্কে কাজ করার সময় মেলানিয়া নাউস কীভাবে তাঁর হবু স্বামীর সাথে পরিচিত হন, সেই গল্পটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থক গোষ্ঠী মাগা আন্দোলনের এক প্রচলিত বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।  গত এপ্রিলে আকস্মিক এক সংবাদ সম্মেলনে মেলানিয়া নিজেও এই বিষয়ের অবতারণা করে পরলোকগত শিশু যৌন পাচারকারী জেফরি এপস্টেইনের সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতার দাবিকে "বিদ্বেষমূলক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা" বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ফাঁস হওয়া উঙ্গারোর অডিও রেকর্ডিংয়ে এই প্রচলিত কাহিনিকে সরাসরি মিথ্যা দাবি করা হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে সন্তান কার হেফাজতে থাকবে তা নিয়ে উঙ্গারো এবং জাম্পোল্লি একটি তিক্ত আইনি লড়াইয়েও লিপ্ত আছেন।

হোয়াটসঅ্যাপের ওই রেকর্ডিংয়ে উঙ্গারোকে বলতে শোনা যায়: "এসো এবার জনতাকে সত্যিটা বলি, যে আপনি কখনোই ট্রাম্পের সাথে মেলানিয়ার পরিচয় করাননি। এটি জেফরি এপস্টেইন করিয়েছিলেন, কারণ মেলানিয়া জেফরির এসকর্ট ছিলেন। এভাবেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। আমি এটা নিশ্চিতভাবে জানি, কারণ আমি ২০ বছর তোমার সাথে ছিলাম এবং তুমি সবসময় আমাকে বলতে, তুমি নও—এপস্টেইনই (ট্রাম্প- মেলানিয়ার) পরিচয় করিয়েছিলেন।"

এই মন্তব্যের বিষয়ে মার্কিন দৈনিক 'দ্য ডেইলি বিস্ট'-এর পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউস এবং মেলানিয়া ট্রাম্পের কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে পাওলো জাম্পোল্লি ডেইলি বিস্টকে বলেছেন, "আমি মনে করি এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক যে সে (উঙ্গারো) আমাদের চমৎকার ফার্স্ট লেডি সম্পর্কে এমন কথা বলার সাহস দেখিয়েছে। আমি সত্যিই তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত এবং আমার মনে হয় তাঁর জরুরি থেরাপি প্রয়োজন।"

জাম্পোল্লি বর্তমানে গ্লোবাল পার্টনারশিপের বিশেষ দূত এবং কেনেডি সেন্টারের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

২০০২ সালের জুনে প্যারিস থেকে নিউইয়র্কগামী এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমান—যা "ললিতা এক্সপ্রেস" নামে কুখ্যাত—তাতে চড়ার সময় উঙ্গারোর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। সে সময় তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর তৎকালীন এজেন্ট এবং ফরাসি মডেলিং স্কাউট জঁ-লুক ব্রুনেল, যিনি এপস্টেইনের জন্য নারী ও কিশোরী সংগ্রহকারী (রিক্রুটার) হিসেবে কাজ করতেন। উঙ্গারো ও ব্রুনেল বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প দম্পতির সামাজিক বৃত্তেই চলাফেরা করতেন এবং মার-এ-লাগো-র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দম্পতির সাথে তাঁদের ছবিও রয়েছে।

উঙ্গারো গত বছরও সংবাদ শিরোনামে এসেছিলেন। সে সময় তিনি অভিযোগ করেন, জাম্পোল্লি ওয়াশিংটনে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সন্তান হেফাজতের বিরোধের জেরে মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাঁকে গ্রেফতার করিয়েছেন। তবে জাম্পোল্লি এবং ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি উভয়ই এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।

উঙ্গারোর 'এক্স' অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা (যা পরবর্তীতে মুছে ফেলা হয়) এই সর্বশেষ দাবিটি এপস্টেইন কেলেঙ্কারিকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। উঙ্গারো ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনে একটি ক্ষমতাশালী পদ পাওয়ার পর জাম্পোল্লি মেলানিয়াকে এবং মেলানিয়া জাম্পোল্লিকে "আড়াল" করার এক সমঝোতা করে চলছেন।

অভিযোগের বিপক্ষে মেলানিয়া ও জাম্পোল্লির অবস্থান

চলতি বছরের ৯ এপ্রিল হোয়াইট হাউসে হঠাৎ এক সংবাদ সম্মেলন করে যৌন অপরাধী এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর কোনোপ্রকার সম্পর্ক না থাকার দাবি করেন মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। এই দাবিটি মেলানিয়া ট্রাম্পের পূর্ববর্তী বক্তব্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। 

এপ্রিল মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে মেলানিয়া সাংবাদিকদের বলেছিলেন: "আমি এপস্টেইনের ভিকটিম নই। এপস্টেইন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেননি। ১৯৯৮ সালে নিউইয়র্কের একটি পার্টিতে ভাগ্যের জোরে আমার স্বামীর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। আমাদের এই প্রথম দেখার বিস্তারিত বিবরণ আমার 'মেলানিয়া' বইটিতে নথিবদ্ধ আছে। ২০০০ সালে ডোনাল্ড এবং আমি একসাথে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় প্রথমবার এপস্টেইনের সাথে আমার দেখা হয়। তার আগে আমি কখনো এপস্টেইনের সাথে দেখা করিনি এবং তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না।"

সে সময় মেলানিয়া ঠিক কী কারণে হঠাৎ এমন প্রতিরক্ষামূলক বিবৃতি দিয়েছিলেন তা স্পষ্ট ছিল না। এমনকি তাঁর এই বক্তব্যে স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পও কিছুটা অবাক হয়েছিলেন বলে মনে হয়েছিল। তবে ওই একই সময়ে উঙ্গারোর পক্ষ থেকে মেলানিয়ার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের রিপ্লাইতে বেশ কিছু পোস্ট করা শুরু হয়, যেখানে উঙ্গারো মেলানিয়াকে চেনেন বলে দাবি করেন এবং "সবকিছু ফাঁস করে দেওয়ার" হুমকি দেন। গত এপ্রিলে এক সাক্ষাৎকারে উঙ্গারো কোনো সুনির্দিষ্ট বিবরণ না দিয়েই বলেছিলেন, "তিনি (মেলানিয়া) জানেন যে আমি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত আপত্তিকর কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি।"

তবে মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশ করা নথিপত্র অনুসারে, এপস্টেইনের একজন সাবেক সহকারীও ইতঃপূর্বে এফবিআই-কে জানিয়েছিলেন যে, এপস্টেইনই ট্রাম্প ও মেলানিয়ার পরিচয় করিয়ে দেন। তা সত্ত্বেও জাম্পোল্লি নিজের দাবিতে অটল রয়েছেন। ডেইলি বিস্টকে দেওয়া আগের এক সাক্ষাৎকারে তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, "কোনো আইনজীবী ছাড়াই আমি এই বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে কংগ্রেসে যেতে রাজি আছি। আমি শুধু বলেছিলাম: 'মেলানিয়া, ইনি ডোনাল্ড; ডোনাল্ড, ইনি মেলানিয়া'—এবং তারপর আমি ওই টেবিল ছেড়ে চলে যাই কারণ— অনুষ্ঠানেস্থলে আমার ৩০০ জন অতিথি ছিল।"

এই অডিও রেকর্ডিংটি প্রথম পোস্ট করেন স্বতন্ত্র সাংবাদিক অ্যান্থনি অ্যান্ড্রুস। তিনি জানান, তাঁকে এটি পোস্ট করতে এবং জাম্পোল্লিকে ট্যাগ করতে অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে গত সোমবার পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়। অ্যান্ড্রুস পরে লেখেন, নেপথ্যে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে চলেছে এবং তিনি কেবল একজন বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করছেন।

জাম্পোল্লি জানিয়েছেন, তাঁর আইনজীবীরা এই মানহানিকর পোস্টের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তিনি আরো দাবি করেছেন, উঙ্গারোর ছড়ানো এই অডিওটি মূলত এআই-জেনারেটেড বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। তবে সাংবাদিক অ্যান্ড্রুস এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, "এই লড়াইয়ে আপনি জিতবেন না। আমার কাছে প্রচুর কন্টেন্ট আছে এবং আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি যে এগুলো এআই দিয়ে তৈরি নয়।"