কংগ্রেস মমতাকে দলে ফেরার প্রস্তাব দিলো
ফাইল ছবি।
ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দিল্লিতে, তখনই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে মমতার সংসদীয় দল। এ অবস্থায় গত দুদিন ধরে দিল্লিতে গুঞ্জন ছিল পুরোনো দল জাতীয় কংগ্রেসে ফিরতে পারেন মমতা। নিজের হাতে গড়া দল ও দলের সাংসদ, বিধায়ক, সংগঠন হারিয়ে একমাত্র ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে একা হয়ে যাওয়া মমতাকে পুনর্বাসন দিতে পারে কংগ্রেস।
গত বুধবার গুঞ্জন ছিল ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খার্গের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক সেরেছেন মমতা। পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল হতে হতে সেই গুঞ্জন ও জল্পনা ক্রমশ জোরালো হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের সূত্রে তথ্যমতে, ইতোমধ্যে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে মমতা এবং অভিষেককে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা যেন অবশিষ্ট দলীয় সংগঠন নিয়ে প্রদেশ কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যান। সেক্ষেত্রে মমতা এবং অভিষেককে জাতীয় স্তরে বড় পদের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। মমতাকে রাহুল খার্গের ডেপুটি হিসেবে কংগ্রেসের জাতীয় সহসভাপতি এবং অভিষেককে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সূত্রের খবর, মমতাকে সোনিয়া জানান, যেভাবে তৃণমূল ভাঙছে, তাতে রক্ষা করা সম্ভব নয়। বরং তিনি চলে এলে, কংগ্রেস নেত্রী হিসেবে কাজ করলে, এখনও সঙ্গে থাকা কর্মী-সমর্থকরাও কংগ্রেসে চলে আসতে পারবেন। এতে কংগ্রেসের হাত শক্ত হবে। কংগ্রেসের হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিকল্প তৈরি করা যেতে পারে।
১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল গড়েন মমতা। এরপর কংগ্রেসকে ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেসকে শক্তিশালী করেছিলেন মমতা। এবার মমতার নিজের হাতে গড়া দলের ভাঙনে এক ঘরে হয়ে যাওয়া মমতাকে একপ্রকার পুনর্বাসন দিতে চায় জাতীয় কংগ্রেস।
মমতার এই যোগদানে লাভবান হবে দুই পক্ষই। মমতার পুনর্বাসনে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে অক্সিজেন পাওয়ার আশা দেখছে কংগ্রেস। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কার্যত দেউলিয়া হয়ে যাওয়া মমতাও কংগ্রেসে যোগদান করলে জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি বিরোধী অন্যতম মুখ হয়ে উঠতে পারবেন।
সূত্রের তথ্যমতে, মঙ্গলবার (৯ জুন) সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে যান মমতা। সেখানে সোনিয়া তাকে এই প্রস্তাব দেন। মমতাকে সোনিয়া জানান, কংগ্রেস নেত্রী হিসেবে কাজ করলে মমতার সঙ্গে থাকা কর্মী-সমর্থকরাও রাজনৈতিক পুনর্বাসন পাবে। একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতে নাম মুছে যাওয়ার পরিবর্তে নতুন ইনিংস শুরু করতে পারবেন মমতার। এতে কংগ্রেসও উপকৃত হবে। রাজ্যে ধুঁকতে থাকা কংগ্রেসের হাত শক্ত হবে। কংগ্রেসের হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিকল্প ব্লক তৈরি হবে।
জল্পনা আরও উসকে দিয়ে বুধবার (১০ জুন) রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েন। তবে বৈঠকের ব্যাপারে কেউই প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। মমতাপন্থি তৃণমূল নেতৃত্ব এখনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে নাম না জানানো শর্তে দলের কয়েকটি সূত্র জানায়, তৃণমূলের ওপর যে হামলা হচ্ছে, দলের নেতাকর্মীরা যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন, তা নিয়ে কংগ্রেসকে পাশে চাওয়া হয়েছে শুধু। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ও তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় যদিও জানিয়েছেন, তারা কংগ্রেসে যাচ্ছেন না। বরং পরিষদীয় দলে আরও হাত শক্ত হচ্ছে তাদের।
এদিন বিকেলে কলকাতায় ফিরে আসেন মমতা। এ সময় তার সম্ভাব্য কংগ্রেসের যোগদানের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোনো রকম কথা বলেননি। বিমানবন্দরে ফেরার সময় তাকে বেশ বিষণ্ণ দেখা গেছে।
তবে এক সময় কংগ্রেসকে ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করা মমতাকে নতুন করে সুযোগ দিতে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের মধ্যে জটিলতা দানা বেধেছে। এক পক্ষের মতে, মমতা ও প্রদেশ কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়েছে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের উপর। অর্থাৎ তারা কংগ্রেসে মমতার যোগদানকে স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছেন। অন্যদিকে আরেক পক্ষ মমতার যোগদানে ছাড়তে পারেন কংগ্রেস। সে হিসেবে মমতার কংগ্রেসে যোগদানের মধ্য দিয়ে কংগ্রেস নতুন আশা দেখলেও ভাঙনের মুখেও পড়বে এ কথা মোটমুটি নিশ্চিত হয়ে গেছে।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেন, ‘রাজনীতি সম্ভাবনাময় শিল্প। অতএব আমরা মনে করি, আরএসএস-এর বিচারধারা, বিজেপির স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে, লাগাতার আন্দোলনে যে রাজনৈতিক দল, ব্যক্তিত্ব, রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়ে কংগ্রেসে আসবেন তাদের সবার জন্য দরজা খোলা।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শুভঙ্কর বলেন, আমাদের কথা, যে কোনো ব্যক্তি যদি রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী মেনে, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সত্যিকারের দম নিয়ে, ভয় না পেয়ে, কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসেন, তাহলে সবার জন্য দরজা খোলা। যদিও আর এক সিনিয়র প্রদেশ কংগ্রেস নেতা ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাবেক বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান বলেন, আগে যোগদান হোক তারপরে এ বিষয়ে কথা বলব।
তৃণমূল কংগ্রেস থেকে অনেকেই কংগ্রেসের যোগদান করতে চাইছেন এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, নর্দমার নোংরা জল পুকুরে, নদীতে কিংবা গঙ্গায় পড়লে গঙ্গার পবিত্র জল নষ্ট করে দেয়। রাজীব গান্ধীকে গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান করে সেই জল পরিষ্কার করতে হয়েছে। তৃণমূলে এখনও যারা আছে তারা সেই নর্দমার নোংরা জল ছাড়া আর কিছু নয়। ওদের নিয়ে কংগ্রেস কেন নিজের ক্ষতি করবে।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) নয়াদিল্লিতে জরুরিভিত্তিতে বৈঠক ডেকেছে কংগ্রেস। মাত্র ১২ ঘন্টার নোটিশে জরুরি ভিত্তিতে দেশের সব রাজ্যের প্রদেশ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের দিল্লিতে ইন্দিরা ভবনে বৈঠকে ডেকেছে কংগ্রেস। এমন ঘটনা কংগ্রেসে বিরল।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এদিন লোকভবন ঘেরাও কর্মসূচিতে ছিলেন। তাকে আটক করেছে পুলিশ। সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে তিনিও দিল্লি উড়ে যাবেন বলে খবর পাওয়া গেছে। স্বাভাবিকভাবে জরুরি বৈঠক ডাকায় প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি মমতাকে নিয়ে বৃহস্পতিবার সিদ্ধান্ত নেবে কংগ্রেস। নাকি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে।