চেরির স্বাস্থ্যগুণ: পুষ্টি উপাদান, উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম

চেরির স্বাস্থ্যগুণ: পুষ্টি উপাদান, উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম

সংগৃহীত ছবি

চেরি ফল নানা রকমের ভিটামিন ও খনিজে ভরপুর, যা শরীরের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

প্রতি ১০০ গ্রাম চেরি থেকে দৈনিক চাহিদার প্রায় ১৮ শতাংশ ভিটামিন সি এবং প্রায় ১০ শতাংশ পটাশিয়াম পাওয়া যায়।

‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রি’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, ভিটামিন সি শরীরকে বিভিন্ন রোগবালাই থেকে রক্ষা করে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। 

অন্যদিকে, পটাশিয়াম পেশির সংকোচন-প্রসারণ সচল রাখতে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক পর্যায়ে ধরে রাখতে সাহায্য করে। 

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক উপাদান 

‘অ্যাডভান্সেস ইন নিউট্রিশন’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা থেকে জানা যায় যে, চেরিতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক (অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি) উপাদান রয়েছে। পাশাপাশি, ‘ফুডস’ জার্নালের আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, চেরি ফ্ল্যাভোনয়েড সমৃদ্ধ একটি ফল, যা শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস (কোষের ক্ষয়) এবং প্রদাহ থেকে রক্ষা করে। 

এটি হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও ভূমিকা রাখতে পারে। চেরির নির্যাস বা এক্সট্রাক্টেও একই ধরনের উপকারী গুণাগুণ রয়েছে। এছাড়া এর পলিফেনল উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত করতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করে। 

পেশির ব্যথা দূর করতে সহায়ক

চেরির অন্যতম বড় একটি গুণ হলো এটি শরীরের প্রদাহ ও পেশির ব্যথা উপশম করতে পারে। এই কাজের জন্য টক চেরি বিশেষভাবে কার্যকরী।

চেরি পেশির দ্রুত ক্লান্তি দূর করতে, ক্ষত নিরাময় করতে এবং পেশির শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। ‘মলিকিউলস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চেরি শারীরিক কর্মক্ষমতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখে।

হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা 

চেরিতে থাকা পটাশিয়াম হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক কাপ চেরি থেকে শরীরের দৈনিক চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পটাশিয়াম পাওয়া যায়। 

পটাশিয়াম হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দিতে সাহায্য করে। ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। 

 

 

ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা হ্রাস 

শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের উচ্চ মাত্রা উচ্চ রক্তচাপ, কিডনিতে পাথর এবং হার্ট ফেইলিউরের মতো সমস্যার সঙ্গে জড়িত। 

‘এভিডেন্স-বেসড কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, চেরি খেলে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমে এবং গেঁটে বাত-এর লক্ষণ, আচমকা তীব্র ব্যথা ও জয়েন্ট ফুলে যাওয়া হ্রাস পায়। 

ছয়টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিয়মিত চেরি বা চেরির রস পানের ফলে গেঁটে বাতের প্রকোপ কমেছে এবং রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাও হ্রাস পেয়েছে। 

ঘুমের মান উন্নত করা 

চেরিতে মেলাটোনিন নামক উপাদান থাকে, যা শরীরের ঘুম ও জাগরণের প্রাকৃতিক চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করে।

‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অব নিউট্রিশন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০ জন ব্যক্তির ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। তাদের একদলকে প্লাসিবো (নকল ওষুধ) এবং অন্য দলকে সাত দিন ধরে টক চেরির রস দেওয়া হয়। চেরির রস পানকারী দলটির শরীরে মেলাটোনিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং তাদের ঘুমের সময় ও মান—উভয়ই উন্নত হয়। 

ডায়েটে চেরি যুক্ত করার সহজ উপায়

দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় চেরি যুক্ত করা খুবই সহজ। এটি যেভাবে খাওয়া যেতে পারে:

তাজা ফল হিসেবে: সরাসরি তাজা চেরি খাওয়া যায় অথবা বিভিন্ন ডেজার্ট বা মিষ্টি খাবারে যোগ করা যায়।

ঝটপট স্ন্যাক্স: শুকনো চেরি, চকলেট চিপস এবং নারকেলের ফ্লেক্স একসঙ্গে মিশিয়ে চমৎকার স্ন্যাক্স তৈরি করা যায়।

সালাদ ও স্মুদি: ফলের সালাদে চেরি মেশানো যায় এবং স্মুদিতে পুষ্টির মান বাড়াতে এটি ব্যবহার করা যায়। 

নোনতা খাবার: ভিন্ন স্বাদের জন্য চেরি পনিরের সঙ্গে খাওয়া যায় কিংবা হালকা রোস্ট করে নেওয়া যায়। 

অতিরিক্ত চেরি খাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে চেরি খেলে কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের পেট সংবেদনশীল, তাদের অতিরিক্ত চেরি খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত; অন্যথায় ডায়রিয়া, গ্যাস এবং পেট ফাঁপার মতো সমস্যা হতে পারে। 

কারো কারো ক্ষেত্রে চেরি থেকে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে। এছাড়া, ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যতালিকায় চেরি যুক্ত করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। 

দৈনিক খাওয়ার নিরাপদ মাত্রা

প্রাপ্তবয়স্ক: দিনে সাধারণত ১৫ থেকে ২৫টি চেরি খেতে পারেন।

শিশু ও কিশোর-কিশোরী: দিনে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি চেরি খাওয়া নিরাপদ।

অতিরিক্ত চেরি খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে, তাই সবসময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত। 

সূত্র: সামা টিভি