দক্ষিণ লেবাননে ২ ইসরায়েলি সেনা নিহত, আহত ৪
সংগৃহীত
দক্ষিণ লেবাননে এক বিস্ফোরণে ইসরায়েলের দুই সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। প্রায় দুই মাসে আগে শুরু হওয়া নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির পর লেবাননে এই প্রথম কোনো ইসরায়েলি সেনা নিহতের ঘটনা ঘটল।
সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বিস্ফোরণে আরো চার সেনা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, ‘মাজদাল জোন’ গ্রামের একটি স্থানে সৈন্যরা প্রবেশের সময় একটি বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরকের ধরনটি এখনো পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।
অবশ্য ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোতে একদিন আগেই এই দুই সেনার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়েছিল।
বুধবার (৫ আগস্ট) দক্ষিণ লেবাননে একাধিক বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে- এমন অভিযোগ তুলে এই হামলা চালানো হয়। একইসঙ্গে ‘মানসুরি’ গ্রামের বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লেবাননের কোনো এলাকার বাসিন্দাদের প্রতি ইসরায়েলের দেওয়া এটিই প্রথম এমন হুঁশিয়ারি।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার ‘তেবনিন’ শহরে ইসরায়েলি হামলায় একজন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ‘বুরজ আল-শেমালি’ গ্রামে রাতভর চালানো হামলায় আরো আটজন আহত হন। লেবাননের বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ জানিয়েছে, মানসুরি এবং মাজদাল জোন এলাকাতেও কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত ২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর দুদিন পর সীমান্ত পেরিয়ে রকেট হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। এর মাধ্যমেই শুরু হয় সাম্প্রতিক ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ। এরপর থেকে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় চার হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে ইসরায়েলি পক্ষে প্রায় ৪০ জন সেনা এবং একজন সামরিক ঠিকাদারসহ তিন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
গত ২০ জুন থেকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বিশাল এলাকা দখল করে রেখেছে এবং সেখানে নিয়মিত বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ লেবাননে নিয়োজিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন (ইউনিফিল) জানিয়েছে, তারা বুধবার ইসরায়েলি বাহিনীর অন্তত ১১৩টি শেল বর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করেছে, যা ২১ জুনের পর একদিনে সর্বোচ্চ।
এমন এক সময়ে এই উত্তেজনা দেখা দিল, যখন গত ২৬ জুনের একটি চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রোমে আলোচনায় বসেছেন লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের যেসব এলাকা ইসরায়েলি বাহিনী দখল করে রেখেছে তা খালি করে দিয়ে লেবানিজ সেনাবাহিনীর হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার কথা। এর বিনিময়ে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র হতে হবে।
তবে হিজবুল্লাহ তাদের অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং লেবানন-ইসরায়েল সরাসরি আলোচনার বিরোধিতা করেছে। দলটি এই চুক্তির অংশ ছিল না। ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো নিশ্চয়তা না পেয়েই লেবানন সরকার অনেক বেশি ছাড় দিয়েছে বলে অভিযোগ তোলে হিজবুল্লাহ।
মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় বুধবারের আলোচনা নির্ধারিত সময়ের আগেই স্থগিত হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার পুনরায় শুরু হয়।
রোমের এই আলোচনা মূলত ‘পাইলট জোন’ বাস্তবায়নের ওপর কেন্দ্র করে এগোচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো- যেসব এলাকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে, সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেবে। গত মাসে একটি পাইলট জোন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এর সূচনা হয়, যা মূলত পূর্বে ইসরায়েলি দখলের বাইরে থাকলেও তাদের হামলার শিকার হয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় লেবাননের সেনাবাহিনী ‘জওতার আল-গারবিয়াহ’ শহরে প্রবেশ করে এবং কিছু বেসামরিক মানুষ সেখানে ফিরে আসে। তবে অনেকেই ফিরে এসে নিজেদের বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখে আবারও এলাকা ছেড়ে চলে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কূটনীতিক এপিকে জানান, লেবানন সরকার চাচ্ছে তাদের পরবর্তী পাইলট জোন যেন ‘খিয়াম’ অথবা ‘বিনত জবেইল’ শহরে করা হয়। দুটি জেলাই সাম্প্রতিক ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধে ভারী লড়াইয়ের সাক্ষী ছিল এবং বর্তমানে তা ইসরায়েলি বাহিনীর দখলেই রয়েছে।
তবে তিন দিনব্যাপী এই আলোচনার আগে লেবাননে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিশেল ঈসা ইঙ্গিত দেন, খুব শিগগির নতুন কোনো পাইলট জোন করা নাও হতে পারে। তিনি বলেন, “খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিলে যে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে, তাদের জীবনই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।”