সড়ক দুর্ঘটনায় দুই ভাইসহ নিহত তিন
সংগৃহীত ছবি
‘বাবা, তুমিতো আমাদের ফেলে চলে গেলে। আমাদের কার কাছে রেখে গেলে। একমাত্র প্রতিবন্ধী ভাই আর মা সহ আমাদের তিনটা বোনকে এখন কে দেখবে। আমরা খাবো কী, আর বাঁচবো কী নিয়ে। বারো দিন পর আমার বিয়ে, তোমাকে ছাড়া কী করে হবে এসব।’- বুক চাপড়ে বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন নাটোরের বড়াইগ্রামের ধামানিয়াপাড়া গ্রামের সাদিয়া খাতুন (১৮)।
তিনি শনিবার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জাহাঙ্গীর আলমের বড় মেয়ে। জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার তালবাড়িয়া এলাকায় বাস ও ভুটভুটির সংঘর্ষে জাহাঙ্গীর আলম ও তার বড় ভাইসহ মোট তিনজন নিহত ও আরও আটজন আহত হয়েছেন।
জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলমের প্রথম সন্তান শাহ আলম (২০) জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। বিছানা থেকে উঠে বসারও ক্ষমতা নেই তার। পরের তিন সন্তানই মেয়ে। সম্প্রতি বড় মেয়ে সাদিয়াকে পাশের তালশো গ্রামে বিয়ে দিয়েছেন। আগামী ২০ আগষ্ট সাধ্যমত অনুষ্ঠান করে মেয়েকে তুলে দেওয়ার দিন নির্ধারিত ছিল। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও চলছিল বাড়িতে। কিন্তু এ ঘটনার পর সবকিছু যেন থমকে গেছে এ পরিবারটির। সকালে অন্যান্যদের সাথে ভুটভুটিতে গরু নিয়ে হাটে যাবার পথে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ খবর শোনার পর বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন জাহাঙ্গীরের স্ত্রী। জানা যায়, ব্যবসা ও ছেলের চিকিৎসায় বড় অঙ্কের ঋণ রয়েছে জাহাঙ্গীরের। এ অবস্থায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে একেবারে পথে বসার উপক্রম হয়েছে পরিবারটির।
দুপুরে ধামানিয়াপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িজুড়ে আত্মীয়-স্বজনদের আহাজারী। স্বজনদের কয়েকজন রাজশাহী গেছেন জাহাঙ্গীরের লাশ আনতে। বাড়ির আঙিনায় খাটিয়ায় শোয়ানো জাহাঙ্গীরের বড় ভাই আক্কাস আলীর (৬৫) লাশ। তাদের ছেলেমেয়ে ও স্বজনরা কাঁদছেন। এ সময় প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন বলেন, তারা চার ভাইয়ের মধ্যে তিন ভাই গরুর ব্যবসা করেন। তিনজনই আজ হাটে যাচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন, আরেকজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
এদিকে, সিরাজগঞ্জে যমুনার ভাঙনে সব হারিয়ে কয়েক বছর আগে উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামে এক খন্ড জমি কিনে বসতি গড়েছিলেন দরিদ্র কৃষক আব্দুর রহমান (৭০)। স্বজনদের নিয়ে কষ্টেই দিন কাটতো তার। গরু পালনের মাধ্যমে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে নাতি মারুফ ও তিনি দুটি গরু কিনতে অন্যদের সাথে একই ভুটভুটিতে হাটে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। দুর্ঘটনায় নিজেও মারা গেলেন, নাতি মারুফও আশঙ্কানজক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একই সাথে গরু কেনার জন্য নিয়ে যাওয়া টাকাগুলো খুইয়ে পরিবারকেও নি:স্ব করে গেলেন তিনি।
বড়াইগ্রাম পৌরসভার সাবেক মেয়র ইসাহাক আলী বলেন, দুর্ঘটনায় দুই ভাইসহ একই এলাকার তিনজন মানুষের মৃত্যুতে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ইতোপূর্বে এমন মৃত্যু আমাদের এলাকায় খুব কমই হয়েছে। এলাকার মানুষও চরম শোকাহত।