‘বসনিয়ার কসাই’ খ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু

‘বসনিয়ার কসাই’ খ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু

ছবিঃ সংগৃহীত।

বসনিয়ার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বসনিয়ান সার্ব জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ মারা গেছেন।‘বসনিয়ার কসাই’ খ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যু হয়েছে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে জাতিসংঘ পরিচালিত একটি কারাগারের হাসপাতালে।

সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরটিএস এবং বসনিয়ান সার্বদের সরকারি টেলিভিশন তার মৃত্যুর খবর জানিয়েছে। পরে জাতিসংঘের এক কর্মকর্তাও ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে ম্লাদিচের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ থেকে ৮৪ বছর।

ম্লাদিচের পরিবারের এক সদস্যও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি কথা বলেন।

১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার মূল হোতা

১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার যুদ্ধের সময় সংঘটিত ভয়াবহতম অপরাধগুলোর অন্যতম ছিল স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা।

এই হত্যাকাণ্ডে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নিরাপদ এলাকা’ স্রেব্রেনিৎসায় অন্তত ৮ হাজার মুসলিম বসনিয়াক নিহত হন।

ম্লাদিচকে ওই গণহত্যার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে দায়ী করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, তার নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় বসনিয়ান সার্ব বাহিনী ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, নিপীড়ন ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধ ঘটায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতার একটি হিসেবে স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডকে বিবেচনা করা হয়।

২০১৭ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিলেন ম্লাদিচ। অবশেষে ২০১১ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর সাবেক যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধাপরাধবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তার বিচার শুরু হয়।

২০১৭ সালে ট্রাইব্যুনাল তাকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

রায়ের সময় ট্রাইব্যুনাল ম্লাদিচের সংঘটিত অপরাধকে মানবজাতির জানা সবচেয়ে জঘন্য অপরাধগুলোর অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

পরবর্তী সময়ে আপিলেও তার যাবজ্জীবন সাজা বহাল থাকে। জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি কারাগারেই কাটান।

শয়তানের প্রতিমূর্তি

ম্লাদিচের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে ছিল বেসামরিক মানুষ হত্যা, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, নির্যাতন এবং জিম্মি করে রাখাসহ একাধিক গুরুতর অপরাধ। তবে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় তার ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান জেইদ রা’দ আল হুসেইন ২০১৭ সালে ম্লাদিচের দণ্ডাদেশের পর তাকে ‘শয়তানের প্রতিমূর্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।

ম্লাদিচের মৃত্যু বসনিয়া যুদ্ধের অন্যতম কুখ্যাত চরিত্রের জীবনের অবসান ঘটালেও ওই যুদ্ধের ক্ষত ও স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার স্মৃতি এখনও বসনিয়া ও হার্জেগোভিনিয়ার মানুষের মধ্যে গভীরভাবে বিদ্যমান।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের বসনিয়া যুদ্ধের সময় প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত হন এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। ইউরোপের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত ওই যুদ্ধের নৃশংসতার জন্য ম্লাদিচসহ একাধিক শীর্ষ বসনিয়ান সার্ব নেতাকে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।