সৌদিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর ৭ প্রবাসীর মরদেহ দেশে এনে দাফন
সংগৃহীত ছবি
সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাতজনের মরদেহ দেশে আসার পর একসঙ্গে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে আত্রাইয়ের মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল কলেজ মাঠে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডে নিহত ও পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ দেশে আসে। তাঁদের মধ্যে সাতজনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। বিমানবন্দর থেকে প্রশাসনের সহায়তায় রাত ২টার দিকে মরদেহগুলো আত্রাইয়ে পৌঁছায়।
সম্মিলিত জানাজায় স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ রেজাউল ইসলাম, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান, আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলমসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। জানাজা শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে নওগাঁর ১২ জন রয়েছেন। পরিচয় শনাক্ত হওয়া সাতজনের মরদেহ দেশে ফিরলেও আঙুলের ছাপ শনাক্ত না হওয়ায় আরও পাঁচজনের মরদেহ এখনো দেশে ফেরেনি। নিহতদের স্বজনেরা দ্রুত তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, আত্রাইয়ের গন্ডগোহালী গ্রামে দুটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতেই কান্নার রোল পড়ে যায়। ওই গ্রামের দুই ভাই মোহন আলী ও সুমন আলীসহ চারজনের মরদেহ একসঙ্গে গ্রামে ফেরে। সন্তানদের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁদের মায়েরা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রামের পরিবেশ।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর পারিবারিকভাবে দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে চারজনের মরদেহ পাশাপাশি দাফন করা হয়। আগে থেকেই তাঁদের জন্য পাশাপাশি চারটি কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছিল। এক পাশে মোহন ও সুমনের এবং অন্য পাশে কলিমুদ্দিন ও রুবেল প্রামাণিকের কবর খোঁড়া হয়। তাঁরা সবাই সৌদি আরবের একই সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন।
নিহত মোহন ও সুমনের মা ময়না খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে দুটো বলত, মা আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফিরব। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করব। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে সুখে থাকব। আমার দুনিয়া থেকে সবকিছুই চলে গেল।’
গন্ডগোহালী গ্রামের বাসিন্দা আপেল মাহমুদ ও ছালেম উদ্দিন বলেন, এর আগে একসঙ্গে এতগুলো মরদেহ তাঁরা কখনো দেখেননি। নিহতরা সবাই পরিবারের উপার্জনের প্রধান উৎস ছিলেন। তাঁদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবেও ভেঙে পড়েছে। অনেকেই ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিলেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ রেজাউল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিবারগুলোকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বাকি মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে কলেজ মাঠে নিহত সাতজনের সম্মিলিত জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।
সৌদি দূতাবাসের পাঠানো তালিকা অনুযায়ী, দেশে ফিরিয়ে আনা সাতজন হলেন—আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে মো. ফরিদ, গন্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী, বজলুর রহমানের ছেলে কলিমুদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।