নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত জাহাজে রাশিয়ায় জ্বালানি পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত জাহাজে রাশিয়ায় জ্বালানি পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

ফাইল ছবি।

ইউক্রেন যুদ্ধ চলার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে রাশিয়ায় জ্বালানি পাঠানো হচ্ছে।এর মধ্যে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কয়েকটি জাহাজও ব্যবহার করা হয়েছে। গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বন্দর নথি ও জাহাজের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, জুলাই ও আগস্টে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি বন্দর থেকে ১ লাখ ৭৬ হাজার টনের বেশি জ্বালানি রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে।

এর বেশিরভাগই ডিজেল। সাতটি ট্যাংকারে করে মোট ১৪ দফায় এসব জ্বালানি রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরে নেওয়া হয়।

ব্যবহৃত সাতটি জাহাজের মধ্যে তিনটি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ দক্ষিণ কোরিয়ার জলসীমায় অন্য একটি জাহাজ থেকে সরাসরি জ্বালানি নিয়ে পরে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়।

জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের এই পদ্ধতিতে পণ্যের প্রকৃত উৎস আড়াল করা সম্ভব।

ফিনল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের বিশ্লেষক আইজ্যাক লেভি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজ দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দর থেকে জ্বালানি নিয়ে রাশিয়ায় গেছে। বিষয়টি বিস্ময়কর।

তার মতে, এতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রচেষ্টা এবং ইউক্রেনের প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থন দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দর নথিতে জ্বালানির মালিক বা বিক্রেতার নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি জ্বালানি পরিবহন করেছে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ‘লায়লা’ নামের একটি ট্যাংকার।

জুলাই ও আগস্টে উলসান বন্দর থেকে ভ্লাদিভস্তকে দুটি যাত্রায় এটি মোট ৫৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে যায়।

আরেকটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘অ্যাস্টোরিয়া’ ১ আগস্ট উলসান বন্দর থেকে প্রায় ১১ হাজার টন জ্বালানি নেয়। নথিতে এর গন্তব্য হিসেবে জাপানের নাম উল্লেখ করা হলেও পরে এটি রাশিয়ার ভ্লাদিভস্তকের দিকে যায়।

‘চংচন’ নামের আরেকটি নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ট্যাংকার কোনো বন্দরে ভেড়েনি। আগস্টের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়োসু বন্দরের কাছে সমুদ্রে থাকা একটি নিষেধাজ্ঞামুক্ত জাহাজ থেকে প্রায় ২৬ হাজার টন জ্বালানি নেয়। এরপর সেটিও ভ্লাদিভস্তকের দিকে যায়।

ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির জ্বালানি উৎপাদন কমে গেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ জানিয়েছে, জুনে রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে তেল পরিশোধনের পরিমাণ দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। গত বছরের তুলনায় ডিজেল উৎপাদনও প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।

ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা হিউআর বলছে, যুদ্ধ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাশিয়াকে এখন বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে।

সামুদ্রিক বাণিজ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির ক্রেতাদের মধ্যে দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি রোসনেফটও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

আগস্টে রাশিয়া সমুদ্রপথে ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন তেলজাত পণ্য আমদানি করেছে। জুলাইয়ের তুলনায় যা সাত গুণের বেশি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এক মাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া থেকেই এসেছে ১ লাখ ১২ হাজার টন বা ৩১ শতাংশ। এই তালিকায় ভারতের পরই দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান।

ইউক্রেনকে দক্ষিণ কোরিয়া মানবিক সহায়তার পাশাপাশি হেলমেট, বডি আর্মার ও মাইন অপসারণের যানসহ প্রাণঘাতী নয় এমন সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে। ২০২৩ সালে ইউক্রেনকে ২৩০ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল দেশটি।

তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখার চেষ্টা করছে দক্ষিণ কোরিয়া। ইউক্রেনকে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ না করার নীতিও বজায় রেখেছে দেশটি। অন্যদিকে মস্কোও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আগ্রহ দেখিয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজ দিয়ে এই জ্বালানি পরিবহন দক্ষিণ কোরিয়ার আইনের লঙ্ঘন বলে মনে হচ্ছে না। দেশটির রাশিয়াবিরোধী নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য শিল্পযন্ত্র, ইলেকট্রনিকস ও যানবাহনের মতো পণ্য রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করা।

দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাহাজগুলো বা এসব জ্বালানি চালানের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তারা জানিয়েছে, রাশিয়ার ওপর দেশটির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ানো হয়েছে এবং এসব বিধিনিষেধ কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরও দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দর ব্যবহার করা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত জাহাজগুলোর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তারা জানিয়েছে, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।