হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বোলসোনারোকে হারিয়ে আবার জয়ী লুলা

হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বোলসোনারোকে হারিয়ে আবার জয়ী লুলা

সংগৃহীত

ব্রাজিলের রুদ্ধশ্বাস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিপক্ষ সেনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারোকে সামান্য ব্যবধানে হারিয়ে চতুর্থ মেয়াদের জন্য জয়ী হয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। দেশটির অফিসিয়াল নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী এই ফলাফল নিশ্চিত করা হয়েছে।

রোববার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের ভোটে লুলা পেয়েছেন ৫১ শতাংশেরও বেশি ভোট। অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ শতাংশের কিছু বেশি ভোট।

‘গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক জয়’: উল্লাসে ভাসছে লুলার শিবির

নির্বাচনে জয়ের পর আনন্দে মেতে উঠেছেন লুলার সমর্থক ও প্রচার দলের সদস্যরা। লুলার নির্বাচনি প্রচার সমন্বয়ক এদিনিও সিলভা সহকর্মীদের নিয়ে উদযাপনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে লেখেন, ‘এই নির্বাচন ব্রাজিলের গণতন্ত্রের জন্য এক ঐতিহাসিক জয়।’

নির্বাচন কমিশন লুলার জয় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত পরাজিত প্রার্থী ফ্লাভিও বোলসোনারো কিংবা তার শিবিরের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া বা পরাজয় স্বীকারের বার্তা দেওয়া হয়নি।

ভোটের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কড়া সমালোচনা করার পর থেকেই ফ্লাভিও বোলসোনারোর প্রচার সমন্বয়ক রজেরিও মারিনহো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নীরব রয়েছেন।

এর আগে আদালতের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি লিখেছিলেন, ‘সুপ্রিম ফেডারেল কোর্টের বিচারকদের এমন সরাসরি হস্তক্ষেপ সত্যি অবিশ্বাস্য ও লজ্জাজনক।’ তিনি আরও লেখেন, ‘গণতন্ত্রের স্বার্থে আশা করি শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং কোনো বিচার বিভাগীয় চক্রান্ত সফল হবে না।’ সে সময় দেশটিতে একনায়কতন্ত্রের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

উল্লেখ্য, ফ্লাভিও বোলসোনারোর বাবা ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জায়ার বোলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে গেলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো নিজের পরাজয় স্বীকার করেননি।

প্রথম ধাপে পিছিয়ে থেকেও লুলার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন

প্রথম ধাপের ভোটে ডানপন্থিদের অভূতপূর্ব উত্থান এবং লুলার পিছিয়ে পড়া দেখে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন তার জয় পাওয়া কঠিন। তবে সব হিসাব-নিকাশ ও তিক্ত লড়াই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ডানপন্থি বোলসোনারোকে হারিয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন বামপন্থি নেতা লুলা।

ব্রাসিলিয়ার সময় রাত আনুমানিক ৯টা ১৩ মিনিটে ব্রাজিলের সুপিরিয়র ইলেক্টরাল কোর্ট লুলার জয় ঘোষণা করে। সে সময় ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, লুলা পেয়েছেন ৫১ শতাংশ ভোট এবং বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.৬৮ শতাংশ ভোট।

ব্রাজিলের আধুনিক ইতিহাসে প্রথম ধাপে হেরে গিয়ে দ্বিতীয় ধাপে জয়ী হওয়ার মতো ঘটনা এবারই প্রথম ঘটালেন লুলা।

তবে নির্বাচনের দিন কিছু এলাকায় গণপরিবহণ বন্ধ রাখার খবরে ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে দেশের কিছু অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির কারণে লুলা ও বোলসোনারো—দুই পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট ভোটগ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেন।

রোববারের এই ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় এই দেশটির ক্ষমতার মসনদে বহাল রইলেন লুলা। ফলে এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করার যে স্বপ্ন ডানপন্থিরা দেখছিল, তা এবার বড় ধাক্কা খেল।

লুলার ঐতিহাসিক ঘুরে দাঁড়ানো ও সামনের চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফার্নান্দো ব্রাঙ্কোলি আল জাজিরাকে জানান, প্রথম ধাপে পিছিয়ে পড়ার পর এভাবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিরে আসার ঘটনা ব্রাজিলের রাজনীতিতে একেবারেই নজিরবিহীন।

তিনি বলেন, এই ফলাফলের প্রভাব অনেক বড়। কারণ লুলার নিজস্ব শিবিরের মানুষসহ অনেকেই ভেবেছিলেন ফ্লাভিও বোলসোনারোই হয়তো বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু লুলা সব অনুমান ভুল প্রমাণ করেছেন।

তবে এই জয়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জও অপেক্ষা করছে লুলার সামনে। আগামী দিনে ব্রাজিলের রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের মোকাবিলা করতে হবে তাকে, যার ফলে নিজের পরিকল্পনা ও নীতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা লুলার জন্য বেশ কঠিন হবে।

ফার্নান্দো ব্রাঙ্কোলির মতে, ‘আমরা নিশ্চিতভাবেই দেখতে পাব যে, লুলার সরকার তাদের সব পরিকল্পনা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারবে না। ছোট ছোট বিষয়ে জয় পেতে হলে তাকে বিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে আপস ও দরকষাকষি করে এগোতে হবে।’

সূত্র: আল-জাজিরা