কাজের গতি বাড়াতে ছিমছাম ডেস্ক

কাজের গতি বাড়াতে ছিমছাম ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

সকাল ৯টা। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ নিয়ে সবেমাত্র অফিসের ডেস্কে এসে বসলেন। দিনটি শুরু করার জন্য যেই না ল্যাপটপটি খুলতে যাবেন, অমনি চোখ আটকে গেল। কীবোর্ডের ওপর পড়ে থাকা আগের দিনের পুরনো ফাইল, এলোমেলো চার্জারের তার আর পেন-হোল্ডারে উপচে পড়া অপ্রয়োজনীয় কলমের ভিড়। কাজের শুরুতেই এমন বিশৃঙ্খলা দেখে আপনার অবচেতন মন কি একটু হলেও ক্লান্ত হয়ে পড়ল না?

আমরা অনেকেই ভাবি, কাজের চাপ মানেই বুঝি অগোছালো টেবিল। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। প্রচলিত একটি কথা আছে, ‘Cluttered desk, cluttered mind’ অর্থাৎ আপনার টেবিল যত অগোছালো, আপনার চিন্তাও ততটাই বিক্ষিপ্ত। অফিসের এই ছোট্ট জগতটিতে প্রশান্তি আর কাজের গতি ফিরিয়ে আনার জাদুকরী মন্ত্র হতে পারে ‘মিনিমালিজম’। দামী আসবাব বা বিশাল ডেকোরেশন নয়, বরং সাদামাটা গোছানো ডেস্কেই লুকিয়ে আছে আপনার প্রোডাক্টিভিটি বাড়ার আসল রহস্য।

আমাদের মস্তিষ্ক একসঙ্গে অনেক বেশি ভিজ্যুয়াল তথ্য প্রসেস করতে পছন্দ করে না। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চোখের সামনে যখন অনেক অগোছালো জিনিস থাকে, তখন আমাদের মনোযোগ বারবার বিঘ্নিত হয়। একে বলা হয় ‘ভিজ্যুয়াল নয়েজ’। 

টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজ, ফাইলের স্তূপ বা পুরনো কফির মগ সবই অবচেতন মনে আপনার স্ট্রেস হরমোন বাড়িয়ে দিচ্ছে। মিনিমালিজম মানে টেবিল একদম শূন্য করে ফেলা নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় ‘নয়েজ’ কমিয়ে কাজের ফোকাস ফিরিয়ে আনা।

মিনিমালিজম চর্চার প্রথম ধাপ হলো মায়া ত্যাগ করা। আপনার ডেস্কে এমন অনেক জিনিস আছে যা গত এক মাসেও আপনার কাজে লাগেনি। নিজেকে প্রশ্ন করুন, “এটা কি আমার প্রতিদিন লাগে?” যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে সেটি ড্রয়ারে রেখে দিন অথবা ফেলে দিন। পেন হোল্ডারে ১০টি কাজ না করা কলম রাখার কোনো মানে নেই। হাতের কাছে ২-৩টি ভালো কলম, একটি ডায়েরি আর পানির বোতল-ব্যাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় এইটুকু জিনিসই ডেস্কের ওপর থাকার জন্য যথেষ্ট।

আধুনিক অফিস ডেস্ক মানেই ল্যাপটপ, মনিটর আর হাজারো তারের সমাহার। ল্যাপটপ বা চার্জারের তারগুলো সাপের মতো পেঁচিয়ে থাকলে তা চোখের শান্তি নষ্ট করে এবং বিরক্তির সৃষ্টি করে। বাজারে এখন সস্তায় ক্যাবল ক্লিপ পাওয়া যায়, যা দিয়ে তারগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা সম্ভব। পাশাপাশি, ডেস্কটপ স্ক্রিনও পরিষ্কার রাখা জরুরি। কম্পিউটারের ওয়ালপেপারটি সাদামাটা রাখুন এবং স্ক্রিনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আইকনগুলো ফোল্ডারে গুছিয়ে ফেলুন। ডিজিটাল মিনিমালিজম আপনার কাজের গতি বাড়াবে জাদুর মতো।

মিনিমালিজম মানেই নিরস বা কাঠখোট্টা পরিবেশ নয়। কাজের ফাঁকে একটু সতেজতা পেতে ডেস্কে রাখতে পারেন একটি ছোট ইনডোর প্ল্যান্ট। মানিপ্ল্যান্ট, জেড প্ল্যান্ট বা স্নেক প্ল্যান্ট খুব কম যত্নেও ভালো থাকে। সবুজের দিকে তাকালে চোখের ক্লান্তি দূর হয়। 

এছাড়া ডেস্কে পরিবারের ডজনখানেক ছবি বা শোপিস না রেখে, ছিমছাম একটি ফ্রেমে প্রিয়জনের একটি ছবি বা একটি অনুপ্রেরণামূলক উক্তি রাখতে পারেন। মনে রাখবেন, এখানে ‘কম’ মানেই ‘বেশি’।

ডেস্ক গুছিয়ে রাখাটা একদিনের প্রজেক্ট নয়, এটি একটি অভ্যাস। জাপানিরা একে বলেন ফাইভ-এস (5S) মেথড। 

দিনের কাজ শেষে অফিস থেকে বের হওয়ার আগে মাত্র ৫ মিনিট সময় নিন। পেনগুলো হোল্ডারে রাখুন, ফাইলগুলো জায়গায় তুলে রাখুন এবং কফির মগটি কিচেনে দিয়ে আসুন। পরদিন সকালে এসে যখন একটি পরিষ্কার ও গোছানো টেবিল পাবেন, তখন কাজের শুরুটাই হবে এক ইতিবাচক মানসিকতা দিয়ে।

জীবনযাত্রায় মিনিমালিজম আনা মানে অভাব নয়, বরং বাহুল্য বর্জন। অফিসের ডেস্কে এই ছোট পরিবর্তনটুকু আপনার কর্মজীবনের স্ট্রেস কমিয়ে সৃজনশীলতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই আজই শুরু হোক অগোছালো টেবিল থেকে মুক্তির অভিযান।