তামাক খাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি করকাঠামোর পরিকল্পনা: গবেষণা

তামাক খাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি করকাঠামোর পরিকল্পনা: গবেষণা

ছবি: সংগৃহীত

তামাকপণ্যে বারবার কর ও দাম বাড়িয়েও সরকারের রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিগারেট খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি প্রকৃত অর্থে কমে গেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের শুরুতে নতুন করে দাম ও কর বাড়ানোর পর এ খাতে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধির গতি একেবারেই থমকে গেছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, তামাকপণ্যে এভাবে বার বার কর ও দাম বাড়ানোর নীতি আর কার্যকরী ফল দিচ্ছে না। সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণের অন্যতম এই খাত থেকে কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে সরকারের সার্বিক রাজস্ব আদায়েও। 
 
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বৈশ্বিক পরামর্শক ও অডিট প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং (ইওয়াই)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, গত ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে সিগারেট খাত থেকে প্রকৃত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কার্যত স্থবির হয়ে গেছে। প্রতিবেদনটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৮-১৯ পর্যন্ত এই ছয় অর্থবছরে সিগারেট খাতে সরকারের রাজস্ব আদায়ে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১.৯ শতাংশ। 

এর পরের ছয় বছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এই ছয় বছরের সিগাররেট খাতে প্রকৃত বা মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ঋণাত্মক, প্রায় -১.৪ শতাংশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা কম।

আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সিগারেটের ন্যূনতম মূল্য ও আবগারি শুল্ক হঠাৎ করে অনেক বাড়ানো হয়। এর ফলে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের গড় দাম আগের সময়ের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেড়ে যায়। এই মূল্যবৃদ্ধির পর টাকার অঙ্কে মোট সিগারেটের বিক্রির পরিমাণ ২০ শতাংশের বেশি কমে যায়। ফলে রাজস্ব আদায় প্রকৃত অর্থে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। যদিও সংখ্যার বিচারে বিক্রির পরিমাণ কমেছে মূলত উচ্চ স্তরের সিগারেটে। নিম্ন স্তরের সিগারেটের বিক্রি কমেনি। উচ্চমূল্যের সিগারেটের দাম বাড়ার পর অনেক ভোক্তা নিম্নস্তরের সিগারেটে নেমে এসেছেন। সর্বশেষ হিসাবে, দেশে ধূমপায়ীদের প্রায় ৯০ শতাংশ এখন নিম্নমূল্যের সিগারেটের ভোক্তা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কর ও দাম বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব বাড়ানো ও তামাকপণ্যের ব্যবহার কমানো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এ দু’টি লক্ষ্যের কোনটিই পূরণ হচ্ছে না। দেশে সিগারেটের কর কাঠামো এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অতিরিক্ত কর বৃদ্ধি থেকে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। উচ্চমূল্যের সিগারেটের দাম বাড়লে অনেক ভোক্তা দ্রুতই নিম্নস্তরের বা তুলনামূলক কম দামের সিগারেটে নেমে আসছেন। এতে শুধু উচ্চ করযুক্ত পণ্যের বিক্রি কমে যাচ্ছে। নিম্নস্তরের সিগারেটের বিক্রি কমছে না, বরং বাড়ছে। 

তামাকসহ রাজস্ব আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে এমন পরিস্থিতির কারণে গত মার্চ পর্যন্ত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের ঘাটতিতে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে সংস্থাটি শুল্ক-কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা পিছিয়ে ছিল, যা এ যাবৎকালের রেকর্ড ঘাটতি।  

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো সময়ে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঘাটতি হয়েছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, যা তখন রেকর্ড ছিল। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই তা ছাড়িয়ে গেছে। লক্ষ্য অর্জনে চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছে। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, তামাকসহ সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রদানকারী বিভিন্ন খাতে বারবার কর ও দাম বাড়িয়েও প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। এর বড় কারণ করের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা। তাই বিদ্যমান কর কাঠামোয় সংস্কার আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।