নিউজিল্যান্ড ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ইরান দল
সংগৃহীত
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে ইরান ফুটবল দল। মেক্সিকোর তিজুয়ানা থেকে ছোট ফ্লাইটে লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছেছে আমির গালেনোইয়ের দল। কিন্তু এই আগমন শুধুই একটি ফুটবল দলের ম্যাচ ভেন্যুতে পৌঁছানোর গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধের আবহ, ভিসা জটিলতা, প্রবাসী ইরানিদের প্রতিবাদ এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের অস্বস্তিকর এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
রোববার তিজুয়ানা থেকে রওনা দিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে ইরান দল। বিমানটি দ্বিতীয় চেষ্টায় অবতরণ করে। সেখান থেকে দলকে নেওয়া হয় হোটেলে, যেখানে আগে থেকেই পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে সোমবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ ‘জি’র ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করবে ইরান। বাংলাদেশ সময় ম্যাচটি মঙ্গলবার সকাল ৭টায়।
ইরান দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি শুরু থেকেই রাজনৈতিক অস্বস্তিতে ঘেরা। শুরুতে তাদের বেস ক্যাম্প থাকার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ভিসা অনিশ্চয়তার কারণে শেষ পর্যন্ত বেস ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়া হয় মেক্সিকোর তিজুয়ানায়। সেখান থেকেই ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াতের পরিকল্পনা করে ইরান ফুটবল ফেডারেশন।
তিজুয়ানায় বিদায়টা অবশ্য ছিল আবেগঘন। হোটেলের বাইরে ইরানি সমর্থকেরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে “টিম মেল্লি” স্লোগান দেন। অনেকেই পতাকা ও প্ল্যাকার্ড হাতে ছিলেন। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, “ইরান, তুমি কখনো একা হাঁটবে না। মেক্সিকো তোমার সঙ্গে আছে।” স্প্যানিশ ভাষায়ও স্লোগান ওঠে, “ইরান, ভাই, তুমি এখন মেক্সিকান।”
তিজুয়ানায় ইরানি কমিউনিটি খুব ছোট। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও বিশ্বকাপের আগে তারা জাতীয় দলকে ঘিরে এক ধরনের ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করে। একজন শিশু পানিনির বিশ্বকাপ স্টিকার অ্যালবামে ইরান দলের পাতা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল। খেলোয়াড়েরাও বাসে ওঠার সময় সমর্থকদের দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেসের ছবিটা ভিন্ন। ইরান দল যখন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়, তখন লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামের কাছে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন প্রবাসী ইরানিরা। তাঁরা গণতন্ত্রের দাবিতে স্লোগান দেন এবং ইরান সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরেন। ব্যানারে লেখা ছিল, “ইরানে শাহ নয়, মোল্লা নয়” এবং “ইরানিরাই শাসনব্যবস্থা বদলাবে।”
প্রতিবাদকারীরা এমন কয়েকজন ক্রীড়াবিদের ছবি ও পোস্টার প্রদর্শন করেন, যাঁরা তাঁদের দাবি অনুযায়ী ইরান সরকারের হাতে গ্রেপ্তারের পর মারা গেছেন। প্রবাসী ইরানিদের একটি অংশের কাছে জাতীয় দলের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ তাই শুধু ফুটবল নয়; বরং ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত এক কঠিন আবেগের বিষয়।
এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ইরান। মাঠে তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা। ইরান এর আগে একাধিকবার বিশ্বকাপে খেললেও কখনো গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি। ২০১৮ সালে মরক্কোকে হারানো, ২০২২ সালে ওয়েলসকে হারানো, এসব সাফল্য থাকলেও পরের ধাপে ওঠার অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষের ম্যাচ তাই ইরানের জন্য বড় সুযোগ। গ্রুপে আছে বেলজিয়াম, মিসর ও নিউজিল্যান্ড। কাগজে-কলমে বেলজিয়াম সবচেয়ে শক্তিশালী দল। তাই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পয়েন্ট হারালে ইরানের পথ শুরুতেই কঠিন হয়ে যাবে। আবার জয় পেলে রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও মাঠের গল্পে ফেরার সুযোগ পাবে তারা।
কোচ আমির গালেনোই ও স্ট্রাইকার মেহদি তারেমির ওপর তাই নজর থাকবে বেশি। তারেমি ইরান আক্রমণের সবচেয়ে বড় নাম। যুদ্ধ, ভিসা, প্রতিবাদ, সবকিছুর বাইরে মাঠে ইরানের আশা তাঁর গোল করার ক্ষমতার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে।
নিউজিল্যান্ডও সুযোগ দেখছে। দীর্ঘদিন পর বিশ্বকাপে ফিরে তারা প্রথম জয়ের খোঁজে। ক্রিস উডদের সামনে ইরান ম্যাচ হতে পারে ইতিহাস গড়ার সুযোগ। কারণ মাঠের বাইরের চাপ যতই থাকুক, ৯০ মিনিটে লড়াই হবে ফুটবলের।
তবে এই ম্যাচের গুরুত্ব শুধু ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে খুব কম ম্যাচই এমন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রেক্ষাপটে হয়েছে। স্বাগতিক দেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত, ভিসা জটিলতা, প্রবাসী প্রতিবাদ এবং কড়া নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে ইরান-নিউজিল্যান্ড ম্যাচের আবহ আলাদা।